Tuesday, 8 October 2024

শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || তপজা মিত্র

 



এই বনপথে || তপজা মিত্র 

আমি যে রাস্তায় হাঁটতে চেয়েছি এখনও সেই রাস্তায় হাঁটতে পারিনি। প্রলয়কালে বুদ্ধিনাশ হল কি আমার? এমনই ভাবছেন মনু, মানবজাতির পিতা। বৈবস্বত মনুর চিন্তাক্লিষ্ট মুখে বলিরেখা স্পষ্ট। দত্তাত্রেয় তুমি জানো কোন সে পথ যে পথে আমি, আমরা হাঁটতে চেয়েছি! কিন্ত তুমি বলবে না। তোমার কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে। বিক্রি হয়ে গিয়েছে। অথচ একদিন তুমি ছিলে বাঙ্ময়, ছিলে নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য থেকে উঠে আসা এক ভৈরব। তুমি পাললিক, আগ্নেয় শিলার মানদণ্ডে জীবনকে না মেপে কখনও এঁটেল, কখনও দোঁআশ মাটিতে জীবনের বীজ বপন করেছ। ফসলও ফলেছে, উত্তুঙ্গ সেই ফসলের শীর্ষে যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন চরাচরে তা প্রতিফলিত হয়।  এই প্রতিফলন মাটিকে স্পর্শ করেছে। দত্তাত্রেয় যা করেছে জনমেজয় কি তাই করেছে? সর্পযজ্ঞ করা কী উচিত? আস্তিকের সংলাপে রক্ষা পাক চির বনপথের আজানুলম্বিত সাপ প্রজন্ম। 
রক্ষাই পেতে হবে। প্রভু রক্ষা করতে হবে। নদী, গাছ, ছোট ছোট গুল্ম, পরাণ-পীরিতি, গিরিখাদ, খনি গহ্বরের উচ্চারিত অন্ধকার....সব সব সব বাঁচাতে হবে। জানি যে পথ দিয়ে মনু হাঁটতে চান সেই পথ তিনি খুঁজছেন, কিন্ত পাচ্ছেন না। সময় খুব জটিল। কলসী কাঁখে জল তুলতে কেউ আর এদিকে আসে না। শিরশির করে হাওয়া বয়, তিরতির করে জল বয়ে চলে , কেউ আর এ ঘাটের রানায় এসে বসে না। উত্তরকালের ভাবী প্রজন্মকে আশীর্বাদ করার জন্য পূর্ব কালের পারিজাতরা আর এদিকে আসেন না। 
মনু শ্রান্ত। বটগাছের ছায়ায় এসে বসলেন। অন্ধকার চারপাশ। মনু চোখ বন্ধ করলেন। এখন আর কোনও বনপথে হাঁটা যাবে না। এই তমসায়, ঘনঘোর মননহীন বিটপীলতায় সোনালি, রূপালি রেখার ছোঁয়া পার হয়ে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। 
তাহলে উপায়?
মনু গিয়ে বসলেন রাজহংসের পাশে। বেলা পড়ে আসছে, সূর্যের আলোর প্রকাশ ক্রমশ কম। গঙ্গার নিস্তব্ধ জলে কোনও তরঙ্গ নেই। মনুর মনে হল জীবন আর গতিশীল নয় যেন। এই বেলা চলে যেতে হবে এখান থেকে।
দূরে ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসছে এক ঘোড়সওয়ার। 
কে তুমি?
আমি চিঠিবাহক।
তুমি রানার!
যা বলবে। তুমি কে?
মনু। মানবজাতির পিতা। 
কী করছ এখানে?
গানের সুর খুঁজছি।
পেলে?
না।
তুমি কার চিঠি বিলি করবে?
সন্ন্যাসীর।
কে তিনি?
চেন না তাঁকে? তিনি ব্যাসদেব।
এই চিঠি দেবর্ষি নারদের। তাঁকে পৌঁছে দিতে হবে।
কোথায় থাকেন তিনি?
সেই রাস্তাই তো খুঁজছি মহাত্মন!
তুমিও রাস্তা খুঁজছ? 
আমরা দুজনেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনর রাস্তা খুঁজছি, কিন্ত পাচ্ছি না। বনপথের নিবিড়, ধীর রাস্তাই আমাদের অভীপ্সা।
সেই রাস্তা কোথায়?
একটি রাস্তা আছে জানি তা গিয়েছে সত্যের দিকে, ন্যায়ের দিকে, আচমন ও নৈবেদ্যের দিকে। সেই রাস্তাই  প্রণামের জ্যোতিতে পরিপূর্ণ। 
চলো এগিয়ে যাই...। যদি খুঁজে পাই বনপথ!


শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়

 

 

করোনার দিনগুলোতে || শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়

১.


নার্সিংহোমের বেড,
আসলে লেখার সাদা পাতা

ড্রিপ চলছে, মাস্ক খুলে দাও নার্স, যেমন সুবিধে

আমাকে উঠিয়ে বসে পেন আনো,
সাদা পাতা দেখে

আমার শরীর জুড়ে রাক্ষসের দাউ দাউ খিদে

২.


'আপনার মস্তিষ্কে গাঢ় কুয়াশা
নি:শব্দে  ঢুকে গেছে

এর নাম ফগি ব্রেন, করোনা হবার পর হয় '

ডক্টর একথা বলে,
প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন-

'ভয় নেই, কুয়াশা শেষে পলাশ ফুটেছে সবসময়'



শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || Rina Kansabanik

 




Poems of Rina Kansabanik 

Adam and Eve 

Meet a young man 
Black hair on the head
Arrogance in the vein 
Dream in the eyes 
Pride in the chest 
Who are you?
My name is Adam. 

Meet a young woman 
Lust in her body 
The joy of creation in the uterus
Unbelievable sight in the eyes
Sorrow in the heart .
Who are you?
My name is Eve.


Echoes of Love


Darling, please tell me you'll come to me,  
For I've spent every day yearning for you.  
You filled my heart with love divine,  
But suddenly, what went awry?

Believe me, I'm pure and true,  
A holy virgin through and through.  
Please say you'll come back to me,  
I lie awake, restless, can't you see?  
Tears flow from dusk till dawn,  
Darling, return to where you belong.

Take me to the river's edge,  
Where the waters gently pledge  
To wash away our pain and woe,  
To let our love's true essence show.

Fly me towards the blazing sun,  
Let its fiery embrace be done.  
Believe me, I'm a holy virgin,  
With a heart that's still so certain.

Please say you'll come to me,  
Please say you'll come to me.



শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || জয়াশিষ ঘোষ

 


আড়বাঁশি || জয়াশিষ ঘোষ

একান্তে বসে আছি
কবেকার অকাল বর্ষণে মুছে গেছে পঞ্চম সঙ্গীত
বিদ্ধ বল্লম থেকে রক্তেরা শুকনো পলাশ
ক্ষত দেবে দাও--
তা ছাড়া দেওয়ার কী আছে , ছাইপাঁশ ?
বনজ গন্ধেরা ভরে আছে আমাদের ঘরে

মানুষ থাকে না আর, আড়বাঁশি ভেঙেছে অধরে..



শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১|| নীলাব্জ চক্রবর্তী

 


নীলাব্জ চক্রবর্তী-র কবিতা

ব্রেক

এই যে স্মৃতি বেয়ে
একটা কাঁচের ক্যালেন্ডার জুড়ে নিচ্ছ
গায়ের ওপর
ফাঁপা পাথরের ওপর
যে আহ্বান
স্পষ্ট হচ্ছে
অভ্যাস অর্থাৎ
রক্তের ভেতর-বাইরে যে ঋতু পড়ে গেল
খুব হল
এই কাগজে কাগজ ঘষে ঘষে
একটা স্থায়ী রক্তপাত
ব্রেক নিল
আর
নীল করল কেমন মুঠো করল…


দৃশ্য থেকে পড়ে যাওয়া ভাষা

একটা হাত-ফসকে-যাওয়া দৃশ্য
লাল হচ্ছে
নীল
জানলার বাইরেও জানলা
ছায়া পড়ছে
গাছ
পড়ছে
স্মৃতি তো একটা আঙুল অবধি নীরবতা
নীরবতা
আসলে
ব্লা ব্লা
কাট
একটা বিস্বাদ লংশট
পার হতে হতে
ভাষার এপার-ওপার দেখা যাচ্ছে না আর...


একটা অনভ্যাসের কবিতা হয়ে

সেফ খেলছে
ডামি দিচ্ছে পুরনো দিনের শো
বেদনা
সুর
উত্তর
কাঁচির এপারে ওপারে থাকা দীর্ঘ শব্দমালা
ফলো করতে করতে একটা অনভ্যাস
নির্বাচন করছে
অস্থির সাম্যের মতো ধাতব স্মৃতির গন্ধ
জল হয়ে জলের কাছে
তিনভাগ কবিতার কাছে
রূপ অর্থে ঘন হয়ে
পাথর-অমনিবাসে গুঁড়ো গুঁড়ো সম্পর্ক লেগেছে
জানলা নম্বর দুই বরাবর
তোমার আমার ঠিক মাঝখান দিয়ে...


যথেষ্ট ফ্রেম

বিষয় একটি সহজ অভ্যাস হয়ে
গাণিতিক হয়ে
অপশন রাখছে
অথবা ধরুন
একটা ফাঁপা পিকচারাইজেশনের ভেতর
আপনি মিটিমিটি বসে আছেন
আর
গানটা পিছলেই যাচ্ছে
দশকের পর দশক
একটাই যথেষ্ট ফ্রেম
ফটোজেনিক হয়ে উঠবে কি উঠবে না
ধানচিত্রের কথা ভাবতে ভাবতে
নয়া নগর ফুরিয়ে এলে
স্প্রিন্ট টানতে টানতে রীল কাটার শব্দ
ছুঁড়ে দিচ্ছেন কার দিকে...


ভাষা অর্থে একটা ফোটোজেনিক অভ্যাসের কথা

আলোর জন্য শুরুয়াৎ অর্থে একটা গভীর ধাতুর কথা। রূপের কথা। কৃৎ ও তদ্ধিত। ডেরিভেটিভের কথা ভাবব না সুপারইম্পোজিশনের? অথচ দেখতে পাচ্ছি ভাঙা ভাঙা একটা দিনের ভেতর বসে স্মৃতি অনুবাদ হচ্ছে। বাদ হচ্ছে। স্তননে কার ছায়া মন করছে। ওম। খুঁড়ে খুঁড়ে। গ্লোরিফাই করছে। ফেনায় ফেনা ঘষতে ঘষতে খুব একটা সাধনার কথা। এনে দে এনে দে ঝুমকা-র কথা। ফোটোজেনিক মানে একটা অভ্যাস। পিছলে যাচ্ছে। দর্পণ অবধি যে স্বেদ যে ঘ্রাণ বারুদ অবধি। ব্যাকফায়ার। এই ঋতু। ক্যাম্পে ক্যাম্পে ভাষা এক শ্রম হয়ে নির্মিত পূর্ণচ্ছেদ হয়ে চলমান...




শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || সৌরভ বর্ধন

 


শ্রম ও জাদুপথ || সৌরভ বর্ধন


১.


অনেক লেখারা আছে
নিশ্চুপ বাষ্পের ছায়াপথ
অনেক জাদুরা আছে
সশব্দ শাসকের ছায়াঘর
ফলত হরিণের পানীয় যেমন জল
বাঘিনীও জলের অভাবে ঘর ছাড়ে

২.


নিজেকে পিশাচ ভাবছি তাই
আর সুখকষ্টে
হারিয়ে যাচ্ছে আরামপ্রদ গাছেরা
দূরে দূরে
নির্বাক স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে
দৃষ্টিহীন পাথর

সহসা দাঁতে কিড়মিড় করে ওঠে
খেলা করে অন্ত্যেষ্টি রাতের গানে
ক্রীড়নক পুতুল সকল

৩.


কথায় এতো যন্ত্রণা
মাথা খাবার হয়ে আসে

আমাদের খাদক ও শাসক
ঘরে ঢোকে শেষ রাতে
যখন কোকিল ও তার ছানা
পচে গেছে, খসে গেছে ছাল ও চামড়া
পূণ্য প্রভাতে!

৪.


বুকের ভেতরে হাত রাখলাম
আর গড়িয়ে নামলো জল
জল নামছে হিংস্র
হাত রাখি, আর কণ্ঠনালী
গড়িয়ে পড়ছে পুষ্টি

মুখরিত পথ, সত্যিকারের
পাথরও হেঁটে যাচ্ছে

৫.


তেষ্টায় শুকিয়ে যায় ব্যথা
ব্যথারই যত আলো
গর্জে উঠছে প্রতি-ডাকে
রাত বাড়ছে, অনেক অনেক
উড়ছে সারা অন্ধকারে ----

অন্ধকারের কালো
আজ সম্মুখে, আজ সমস্বরে

৬.


স্বপ্নের বিস্ফোরণ
ঘটে গেছে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল নাচে
আড়মোড়া ভাঙা হাঁ-য়ে

সেঁধিয়ে যাওয়া স্বপ্নের জাদু
ঘাঁপটে আছে অনন্তকাল
পরিখাশূন্য ------
ওকে একটু জল দাও
করো প্রথম আঘাতেই হা-হতোস্মি

৭.


শব্দ, আরও শব্দ দাও
ভাব, তীব্র ভাব এনে দাও
দৃশ্য গঠনের একটা চিত্র
আমি অবিকল ধরতে চাই গর্জনে

যেভাবে অর্জন করে মেয়েরা
শ্রমের খাবার, পরিশ্রমের দিনলিপি
আর অবগাহন রাত দখলে

৮.


ঘুম আর ফুরোয় না
ঘুমের ঠোক্কর খেয়ে শুকিয়ে যায় চোখ
আমাদের যাত্রাপথ লীলার দিকে

যেদিকে জেগে থাকে দশমিক
যেদিকে সব পথ সমসত্ত্ব দ্রবণে

৯.


রাত আসে
আর ফুরিয়ে যায় ক্ষতিপূরণ
জেগে থাকা চোখের দিকে তাকালে
বিস্তৃত মণি আরও সাদা
জ্ঞানগর্ভ হয়ে যায়
তোমাদের হাতে ছেড়ে দিই তাকে
রাতের দখল
ফণা তোলে স্বাধীনতায়, আঘাতে

১০.


আমাদের শ্রমের ভিতর
কারা যেন গুজব ছড়ায়
কারা যেন শীতল কল্পনা দিয়ে ছুরি আঁকে
----- অস্ত্রের ভেতরে কোনো খাদ্য নেই!

যেসব খাদককে আমরা মুখ ভাবি
তাদেরও নিবিড় নিবিড়তর ভুখ এখন
যেন অকস্মাৎ রৌদ্রে ধাঁধিয়ে গেছে চিল

 

 

শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || প্রদীপ আচার্য

 




পুজোর প্রেম, শেম শেম || প্রদীপ আচার্য 

সপ্তমীতে সকালবেলা 
রিনির সঙ্গে আছে অ্যাপো
মধ্যিখানে বিকেলবেলা 
ঘণ্টা দুয়েক আছে গ্যাপও।
সন্ধেবেলা বাড়ি তো ফাঁকা
আসবে রিয়া বোক্কা মেয়ে,
ফাঁকা বাড়িতে থাকব দু'জন
খুলে নেব সব এক্কা পেয়ে। 

অষ্টমীতে প্যান্ডেলে গ্যে
পাড়ার মিমিকে করব ঝাড়ি
বিকেল হলেই মেট্রো চেপে
টালিগঞ্জে দেব পাড়ি।
টালিগঞ্জের নেকু সুমি
সে তো পা বাড়িয়ে আছে
সুযোগ বুঝে এক ঝটকায় 
টেনে নেব বুকের কাছে। 

নবমীতে অন্ধকারে 
বাড়াবাড়ি হয় হোক সে,
সিনেমা তো দেখব থোড়াই 
স্টার মলের আইনক্সে।
গুনে গুনে অন্তরাকে
একহাজারটা চুমু খাব।
সন্ধের পর ফিরেই সোজা
সুদেষ্ণাদের বাড়ি যাব। 

সুদেষ্ণাদের বাড়ির পুজো
অন্ধকারে ছাদে যাব।
সুদেষ্ণা খুব সাহসী মেয়ে
না চাইতেই অনেক পাব।
দশমীতে সকালে আড্ডা
পেগ চলবে সন্ধে হলে, 
নেশা চড়লে কাঁদব তখন
আবার এসো মা মা বলে।



শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || দেবব্রত রায়

 



অনিমেষ মিত্তিরের শরীরে জিরোদের চাকরি পাওয়া চামড়া 
দেবব্রত রায় 

জেলফেরত অনিমেষ মিত্তির সবসময় হাতে কুয়ো-দড়ির মতো একগাছা দড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ! সবসময়, বলতে যতক্ষণ তাকে রাস্তায়ঘাটে দেখা যায় আর-কি ! কারোর বাড়ির ভিতরে তো আর উঁকিঝুঁকি মেরে দেখা যায় না !  সেটা মানুষের ভদ্রতায় ঠেকে। 
অনিমেষ নিজে অবশ্য, তার সাতজন্মেও এসব ভদ্রতাটদ্রতার ধার ধারত না। দিনেদুপুরে ছেলেমেয়ে, মা-বোনের সামনেই বউকে বিছানায় টেনে নিয়ে গিয়ে তার শায়ার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে  সুড়সুড়ি দিতে দিতে বলত, আমার কাছে বেশি সতীগিরি মারাতে এসো না ! মেয়েদের ভগায় জল গড়ালেই, সব ছেনাল-মাগী হয়ে যায় !  
অনিমেষের একসময়কার বুজুম ফ্রেন্ড পরেশ ঘোষ মাঝে-মাঝেই আমাদের ঠেকে আসতেন। আমরা সিগারেট ফুকতাম। পরেশ ঘোষ পকেটে করে ডেটলের শিশির মতো একটা ছোট কনটেনারে ভরে ষাট-এমএল-এর মতো হুইস্কি নিয়ে আসতেন। কথার ফাঁকে-ফাঁকে সেটার থেকে দু-এক সিপ করে নিতেন। আমাদের ঠেকে একমাত্র, ল্যাংড়া মোফিদেরই গাঁজার নেশা ছিল। তাও আবার, লাল শালু দিয়ে মোড়া কল্কেতে ভরে ! পরেশ ঘোষের সেন্স অফ হিউমার ছিল মারাত্মক ! একটু নেশা হলেই, তিনি শান্তি-জলের মতন, অনিমেষ মিত্তিরের যত কেচ্ছা-কাহিনী, সব দরাজ-হাতে আমাদের উপর ছেটাতে শুরু করতেন ! আর মাঝে-মধ্যে ল্যাংড়া মোফিদকে রাগানোর জন্য হাতের কনটেনারটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলতেন, ভায়া, ধোঁয়ায় একটু জল মেশাও ! না-হলে ঘরময় ওড়াউড়ি করছে যে ! মোফিদ কল্কেতে দু-টান দিলেই নিজেকে জাক দেরিদা মনে করত ! সে বলত," উঁহু, মোটেই জল দেওয়া যাবে না। আমি চাই ধোঁয়াগুলো সব মেঘদূত হয়ে উড়ে যাক ! ওরা রিম্পিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুক, ইজ সি লাভ মি অর নট ?  " ইঞ্জিনিয়ারিং-কলেজের এক ক্লাস জুনিয়র রিম্পি ছিল মোফিদের হার্টথ্রব ! কিন্তু মোফিদ তার হার্টথ্রব ছিল কিনা, সেটা বোধহয়, ওর জানা ছিল না ! একদিন শিলিগুড়ি মার্কেটে প্রেম নিবেদন করতে যেতেই, রিম্পি তার হাই-হিল জুতো খুলে মোফিদকে তাড়া করেছিল ! সে রাতেই মফিদ লুকিয়ে মেয়েদের হোস্টেলের ছাদে উঠে শোলের বীরুর মতো, সেখান থেকে " গুড বাই! গুড বাই! " বলে , সত্যি-সত্যিই ঝাপ দিয়েছিল ! ওর সেই গুডবাই-যাত্রায় কোনোক্রমে সেবার প্রাণে বেঁচে গেলেও, মোফিদের একটা পা অ্যাম্পুট করতে হয়েছিল ! তারপর সুস্থ হয়ে কলকাতায় ফিরে সেই যে আমাদের ঠেকে এসে ঢুকেছিল, আর বেরোয়নি ! হাজরা-মোড়ের যে উদুক্ষুলে মেসটাতে আমরা থাকি, সেখানে মোফিদেরও একটা বেড রাখা ছিল। সারাদিন সেটাতেই ও মড়ার মতন পড়ে থাকত ! আর রাত হলেই তার যত বিত্তাপ বাড়ত ! 
আমাদের ঠেকে আলোচনার কোনো পিতৃদেব-মাতৃদেব ছিল না ! যে যা পারত তাই নিয়েই চিৎকার-চেচামেচির একটা রেনেসাঁ আরম্ভ করে  দিত ! কবি তৌসিফ বিলাল কখনো-সখনো আমাদের আড্ডায় এসে হাজির হতেন। তিনি আমাদের ঠেকটার নাম দিয়েছিলেন, বাস্টার্ডস ব্যাটেল ! 
একদিন কী প্রসঙ্গে যেন অনিমেষ মিত্তিরের কথা উঠতেই, পরেশ ঘোষ বলেছিলেন, " আসলে অনিমেষের চামড়া অনেকটা ওই জিরো-ব্যালেন্সে চাকরি পাওয়া ছোকরা-ছুকরিগুলোর মতন !  লজ্জা-ঘৃণা-অপমান, এসব-কিছুই ও শালার চামড়াকে ছুঁতে পারে না ! অথচ দেখ, দিব্বি হাওয়া থেকে অক্সিজেন নিচ্ছে, রোদ নিচ্ছে, বুক ঠুকে টারজানগিরিও দেখাচ্ছে ! তবে সমস্যাটা কী জান, অনিমেষের ওই চামড়ার জন্যই ওর শরীরের ভিতরে জমে ওঠা বর্জ্যটর্য্যগুলো মোটেই  বেরিয়ে আসতে পারে না !  আর সেটাই হলো যত গণ্ডগোলের কারণ ! পরেশ ঘোষের কথা শুনে তৌসিফ বলেছিলেন , অনিমেষ মিত্তির আসলে, একখানা ত্র্যহস্পর্শ-প্রুফ জিনিস ! 
তৌসিফের এই ত্র্যহস্পর্শ-প্রুফ জিনিসটি নাকি,   এতটাই নোংরা ছিল যে, সদর দরজা হাট করে খোলা আছে দেখেও সে বউকে জড়িয়ে ধরে তার ব্লাউজের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিত। বোন এমনকী, নিজের মেয়েদেরও কথায়-কথায়, বেশ্যা, লোটী বলে খিস্তি মারত ! হাত দিয়ে নোংরা-ইঙ্গিত করে একসময় অনিমেষকে যারা খিস্তিখাস্তা মারতে দেখেছেন , তাঁরা বলতেন, সে-সময় নাকি, অনিমেষকে দেখলে মনেই হতো না, যে ও কোনো কলেজে পড়ায় ! আর এসব কারণেই, অনিমেষের আত্মীয়-স্বজন, কলিগস এমনকী, ওর বন্ধুবান্ধবরাও একেবারে মুখোমুখি না-হয়ে পড়লে সাধারণত, অনিমেষকে আজও এড়িয়েই চলে !  
আদিগঙ্গার ধারে গজিয়ে ওঠা বস্তিটার থেকে বারো ঘরে কাজ করতে আসা নাসপাতি প্রত্যেকদিন বাসবের দোকানের ঝাঁপ বন্ধের আগে ওর ঘুগনির ডেকচি, থালা-বাসন, চায়ের সসপেন-টসপেনগুলো ধোয়াধুয়ি করে দেয়। আর তারপর বাসবের সঙ্গে তার ইস্পেশাল গপ্পেসপ্পোর মাঝে একদিন নাকি, সে বাসবকে বলেছিল, অনিমেষ মিত্তির বিছানাতেও, ওই দড়িটা নিয়েই শোয় ! সে নাকি, দড়িটাকে ধমকে-চমকে বশ মানানোর চেষ্টা করে ! এই কথাটা অবশ্য, অনিমেষ মিত্তিরের বউইয়ের কাছ থেকেই নাসপাতি শুনেছে ! 
 আজকাল অনিমেষ রাতের বেলাতেও ঘরে টিকতে পারে না। ঘরে থাকলেই, তাকে নাকি, কড়িকাঠগুলো ডাকতে শুরু করে ! বলে, আয় অনিমেষ, ঝুলে পড় ! একবার ঝুলে পড়তে পারলেই সব শান্তিই-শান্তি ! 
অনিমেষও ঝুলে পড়তে চায় । কিন্তু পারে না। মরতে ওর খুব ভয় । গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলার দৃশ্যটা মনে করলেই, সে ঘামতে থাকে। ওর হাত-পাগুলো বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে অ্যানাটমির মরা ব্যাং-কে সেলের চার্জ মারলে যেমন কাঁপে, তেমনি কাঁপতে শুরু করে !  
অনিমেষের বউ জয়ন্তী নাকি, অনেকবার দড়িটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে । দু-একবার তো পুড়িয়ে ফেলতেও গেছিল কিন্তু, অনিমেষ জানোয়ারের মতো ওর বউয়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে প্রত্যেকবারই দড়িটা কেড়ে নিয়েছে !  
একদিন বাসবের চায়ের দোকানে হাতের দড়িটা ঝুপ করে নামিয়ে রেখে অনিমেষ মিত্তির হটাৎ-ই, আমার পাশে এসে বসে পড়ে বলেছিল, একটা চা খাওয়াবেন ভাই ! যদিও অনিমেষ মিত্তিরকে আমি খুব-একটা পছন্দ করি না। লোকটা কলেজের লেকচারার ছিল অথচ, বহুবার ওকে ব্লু-ফ্লিম দেখার জন্য সিনেমাহলে ঢুকতে দেখেছি আমি !  তবুও লোকটার উপর কেমন যেন মায়া হলো আজ ! আমি ওর দিকে তাকিয়ে লক্ষ করলাম, অনিমেষ মিত্তিরের চেহারাটা একেবারেই চামচিকের মতো চিমসেপারা হয়ে পড়েছে ! এমনকী ওর কণ্ঠার হাড়গুলোও বাইরের দিকে যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে ! একবার নজর দিতেই মনে হলো, নিঃশ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হচ্ছে অনিমেষ মিত্তিরের !  
বললাম, বিস্কুট খাবেন ? কথাটা শোনামাত্রই, অনিমেষ মিত্তির,  " না, বিস্কুট না! বিস্কুট না! গলায় লেগে যাবে! " বলে হটাৎ-ই , এমনভাবে  চিৎকার শুরু করল , আমি তো বটেই , বাসবও এতটাই চমকে উঠেছিল যে ওর হাত থেকে দুটো চায়ের ভাঁড়ই মেঝেতে পড়ে ভেঙেচুড়ে চারদিক একেবারে চায়ে-ভাঁড়ের টুকরোই একাকার হয়ে গেল ! এদিকে অনিমেষ মিত্তিরের তখন দমটম আঁটকিয়ে একেবারে একশা-কাণ্ড ! আমি বাসবকে তাড়াতাড়ি একগ্লাস জল দিতে বললাম। কিন্তু বাসব মেঝে পরিষ্কার করতে করতে অনিমেষের দিকে এমনভাবে তাকাল যে এই দিনে-দুপুরে অন্ধকার নেমে এলেই যেন সে বেঁচে যেত !  আমি বাসবকে একটু ধমক দিয়েই বললাম, " ওর উপর রাগ করে কোনো লাভ আছে ! " দেখলাম তাতেও বাসবের তিরিক্ষি ভাবটা কমল না। তখন বললাম, " ঠিক আছে, আমি তোমার এই চায়ের দাম দিয়ে দেবো। " বাসব আমার কথার কোনো উত্তর না-দিয়ে ভাঁড়ের টুকরোগুলো ডাস্টবিনে ফেলে এসে আগে হাত-পা ধুল তারপর একটা জলভর্তি জগ শব্দ করে আমাদের টেবিলে নামিয়ে রাখল। 
বাসব আবারও ওভেনে চা বসিয়েছে। আমি প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে একটা নিজে ধরালাম আর একটা অনিমেষ মিত্তিরের দিকে এগিয়ে দিলাম। দেখলাম অনিমেষ মিত্তির সিগারেটটা নিয়ে অর্ধেকটা ভেঙে তার পকেটে রাখল আর অর্ধেকটা ধরিয়ে টানতে লাগল। কিন্তু  সিগারেটের ধোঁয়াটা একবারের জন্যেও গিলল না ! অনিমেষ তার গালের ভিতরে ধোঁয়াটা নিয়ে প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ফুক-ফুক করে তা ছাড়তে লাগল ! 
আমার মনের ভিতরে জমে থাকা এতদিনের কৌতুহলটা আর সামলাতে পারলাম না ! জিজ্ঞেস করেই বসলাম। বললাম, আপনি এই দড়িটা নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরে বেড়ান কেন ? অনিমেষ বেশ-কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বললো, আপনি আমাকে চা-সিগারেটে খাওয়াচ্ছেন মানেই এই নয়, যে আমার প্রাইভেসিতে নাক গলাবার অধিকার পেয়ে গেছেন ! 
ইচ্ছে হলো, লোকটার মাথাটা পাশের দেয়ালে সজোরে ঠুকে দিই ! কিন্তু একটু আগেই বাসবকে জ্ঞান দিয়েছি তাই, ওর অপমানটা হজম করেই চুপচাপ সিগারেট টানতে লাগলাম। বাসব চা দিয়ে গেল, সেই জলের জগ নামানোর মতো শব্দ করেই। অনিমেষ মিত্তির ফু দিয়ে চা ঠাণ্ডা করতে- করতে আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, " রাগ করলেন? আসলে নিজের লজ্জার কথা তো তাই, কাউকে বলতে চাই না ! তাছাড়া কথাগুলো বললে কেউ বিশ্বাস করতেও চায় না ! হয়তো আপনিও বিশ্বাস করবেন না, যদি বলি, এই দড়ির ভিতরে আমার বোন নেড়ির আত্মা আছে ! " কথাগুলো বলার মাঝেই অনিমেষের একটা দমকা কাশি উঠল। সে তাড়াতাড়ি জগটার থেকে  কয়েক ঢোক জল খেয়ে একটু দম নিল। তারপর খুব বিষণ্ণ সুরে বললো, এখনো আমি ওকে ভয় দেখায়, নোংরা-নোংরা গালাগাল দিই তবুও, নেড়ি কিছুতেই আমাকে ঝুলতে দিতে চায় না ! বলে, গলায় দড়ি দিলে খুব কষ্ট হয় রে দাদা ! ওরকম করিস না ! " অনিমেষ মিত্তিরের কথাগুলো শুনে সত্যি-সত্যিই আমার হাসি পেল ! কিন্তু এই মুহূর্তে হেসে ফেলাটা অনুচিত কাজ হবে ভেবে গলা পরিষ্কার করার মতো করে কেশে নিয়ে সেটা আটকালাম ! তাতে যে সে কী বুঝল কে জানে ! চা-টা ঢকঢক করে গলায় ঢেলে হটাৎ-ই, দড়িটা হাতে নিয়ে অনিমেষ মিত্তির প্রায় তিন লাফে রাস্তায় নেমেই একেবারে এক-দৌড়ে হাজরার মোড় পার হয়ে গেল ! আমি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় ঘোরালাম। তারপর চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে-দিতে বললাম, বাসব, নেড়ির কেসটা কী ! 
পরেশ ঘোষ অনিমেষ মিত্তিরের বিষয়ে অনেক গল্পই করেন অথচ, এই নেড়ির ব্যাপারে  কোনোদিন একটা কথাও বলেননি আমাদের। 
বাসব ওভেনটা পরিষ্কার করছিল। বললো, এই শালা অনিমেষ মিত্তির একটা চুতিয়া-বাচ্চা ! বছর দশেক আগে বিএলআরওর একটা দালালকে ঘুষ খাইয়ে ওদের বাপুতে সম্পত্তির সমস্ত রেকর্ডপত্র  থেকেই ওর বোন ওই নেড়ি মানে, স্বপ্নার নামটা বাদ দিয়ে দিয়েছিল ! তারপর আর কি! নেড়ি ওর দাদার এইসব কীর্তিকলাপ জানার পর গলায় দড়ি দিয়েছিল ! একসময় ওদের এলাকার লোকজন ,ওর কাকা-জ্যেঠারা ব্যাপারটা জানতে পেরে থানায় এফআইআর করেছিল ! কিন্তু তাতে কী-আর হলো ! মামুদের ভুঁড়ি তো কিছুতেই আটে না ! হাতে যেমন-যেমন নোট গুঁজবে কেস সেরকম সাজানো হবে !  ফলে ছ-মাস পরেই এই চুতিয়া অনিমেষও বেল পেয়ে গেল! কিন্তু পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না ! দেখছ তো ওর অবস্থাটা ! 

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এর জন্য কি ওর চামড়াটাই দায়ী ! পরেশ ঘোষ বলেছিলেন, ওর চামড়াটা এতই মোটা যে ভিতরের বর্জ্যগুলোও বেরিয়ে আসতে পারে না ! 


শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১|| নির্মল রায়


 


ইউরেশিয়া-ককেশাসের কবিতা আজারবাইজান || বাংলা অনুবাদ- নির্মল রায়
কবি ভাগিফ সামাদোঘলু [Vagif Samadoghlu]

ইউরেশিয়ার ককেশাস অঞ্চলের দেশ আজারবাইজানের প্রথম সারির স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের অধিকারী হিসেবে কবি ভাগিফ সামাদোঘলু বিবেচিত হন। ১৯৩৯ সালে ৫ই জুন তিনি বাকুতে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালে তিনি 'ন্যাশনাল পোয়েট অফ আজারবাইজান' এই উপাধিতে ভূষিত হন।

ভাগিফ সামাদোঘলু  আজারবাইজান পার্লামেন্ট (মিলি মজলিস)- এর সদস্য। উচ্চাঙ্গ সংগীতে পিয়ানোবাদক হিসেবেও তিনি সমাদৃত। কবি হিসেবে তাঁর বিশেষত্ব থাকলেও তিনি একজন সফল নাট্যকার হিসেবেও প্রতিষ্ঠালাভ করেন।

কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-এ টেলিগ্রাম ফ্রম দি রোড(১৯৬৮), ফরচুন অফ দি ডে(১৯৭২), আই এম হিয়ার, গড(১৯৯৬),ফার ফ্রম ইংল্যান্ড(১৯৯৯), দি রিং অফ ফরচুন(১৯৯৯)।



পথের নক্সা [Road Map,1986]

আমি কোথায়?
কোথায়? আমাকে বল।
প্লিজ, কিছুটা আলো ফেল
এই জায়গায় শুধু একটুখানি,
আর আমাকে দেখতে দাও কোথায় আমি,
এমনকি আমি যদি আর কখনো      এখান থেকে বেরোতে না পারি

স্বর্গ আর নরক [Heaven and Hell,1964] 

যখন আমি স্বর্গ দেখতে চাই
আমি আমার চোখগুলো বন্ধ করি।
যখন আমি নরক দেখতে চাই
আমি সেগুলোকে খুলে রাখি।

উদ্দেশ্য [ Purpose,1982]

এই চলছে অবিরাম গুঞ্জন
আমার মস্তিষ্কে আবার।
এটা আবার শুরু হয়েছে...
কে অথবা কি আমার দরকার,
হে ঈশ্বর?
অনেক দরজা কি রয়ে গেছে
জীবনের বারান্দায়?
আমি এক অন্ধ মানুষের হাতে ধরা
ছবির মত...


অচেতন [Unconscious, 1968]

অচেতন
দেখ,
আমরা এই বইটা পড়া শেষ করব
আমরা জেনে নেব ঘাতক কে।
তারপর আমরা ঘুমিয়ে পড়ব,
একই বালিশে মাথা রেখে।
আমরা আমাদের জীবন কাটাবো এভাবে,
একই ঘরবাড়ি আর একই বাচ্চা ভাগাভাগি করে,
আর আমাদের মাথা একই বালিশে
এত কাছাকাছি, তবু এত অচেতন।

শিক্ষালয় [Tutorial, 1982]

আমাকে শেখাও কিভাবে                কবিতা লিখতে হয়,
আমাকে শেখাও,                          নেকড়ের থাবার আঁকা ছবি।
শেখাও আমাকে যাতে অন্যেরা জানে
কোথার থেকে আমার কথাগুলো আসে আর কোথায় তারা যায়।
আমাকে শেখাও যাতে                      আমার কবিতা গুলো
তোমার মত বেঁচে থাকা আর          মাটিতে থাকার অধিকার পায়,
আমাকে শেখাও,নেকড়ের থাবার আঁকা...




শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১|| কার্তিক ঢক্

 





গৃধিনীর ফুট-স্টেপ || কার্তিক ঢক্ 


এখন তোমার একাকিত্বকে সঙ্গ দিচ্ছে নিরবতার সা রে গা মা...

যদি নদীতে যাও,দেখবে খানিক বালি পেরিয়ে জল - তারপর খলবল্...

আসলে বালি ভেজানোর ঢেউ নেই
তোমার পায়ে!
ফড়িঙের মতো জলকে ছুঁতে চাও তুমি...

জলের যে শব্দ আছে - আছে জলজ প্রসাধনী -
তাকে কবে গায়ে মেখেছো?

তোমার বায়োমেট্রিকে গৃধিনীর ফুট-স্টেপ!
জল তো জল-ই
অযথায় ঘোলা করছো তাকে...





শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || তামিমৌ ত্রমি

 


রাগী মেয়েদের কবিতা || তামিমৌ ত্রমি 

আমরা ভীষণ ক্ষেপে যাচ্ছি আজ
আমরা কিন্তু চরম ক্ষেপে যাচ্ছি
গলা দিয়ে ভাত নামে না কারো
শূন্য থালায় কান্না দলা খাচ্ছি 

সারাজীবন মানিয়ে নেব আমরা?
সবটা বুঝেও থাকব চির অবুঝ?
অনেক হল। ফোস্কা ফেটে গেছে।
এবার বেরোক অসম্মানের ঘা পুঁজ।

কারা বলে রাত আমাদের জন্য নয়
নিক্তি দিয়ে ওজন করে মরাবাঁচা
এমন আজব সভ্যতা গড়ছে কারা
জানোয়াররা মুক্ত ঘোরে, মানুষ খাঁচায়!!

অঙ্গে দেব তাই যা চায় আমার মন
আমার পোষাক ঠিক করবার তোমরা কে!!
আঁচল দিয়ে তফাৎ কর কে সতী, 
ল্যাম্পপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা চর্বি মেয়ে!

আমরা কিন্তু সক্কলে জোট বেঁধেছি
শান্ত গৃহকোণটি হোক বা রাজপথ
সকাল বিকেল সাঁঝ গোধূলি রাত্রি ভোর
ভুলছি না যুদ্ধটা আর শপথ

আমরা কিন্তু প্রত্যেকেই রক্তবীজ 
একটা মরলে লক্ষ লক্ষ রক্তকণা
জন্ম দেবে লক্ষ শ্যামা দুর্গা কালীর
ক'জনকে করবি তোরা তিলোত্তমা? 

'নারী মানেই অবলা ভীরু সুকুমারী 
কুসুম কোমল নির্গলিত ও নিষ্পাপ...'
বলছে যারা দুকান খুলে শুনুক এবার
গলানো লোহা জমলে কিন্তু সে ইস্পাত

গলানো লোহা
                     জমলে কিন্তু
                                         সে ইস্পাত


শারদীয় সংখ্যা ১৪৩১ || অভিজিৎ দাস কর্মকার

 




উদগ্র বাসনা || অভিজিৎ দাস কর্মকার 


হাসির আবডালে লুকিয়ে আছে
নিয়তির খেলা

সেবার ধান তোলার পর বৃষ্টি এসেছিল 
সেবার পোয়াতি গাভির বকনা হয়েছিল 

অথচ তার কপালে লকলকে সাদা টিক ছিল 
পরিপাটি

এভাবে সময় পেরিয়ে যায়
বয়সের গোঁড়া আলগা হয়ে আসে

পায়ের তালুতে ভর করে রোদের রং

এবার আশ্বিনে মেঘাভ্র উদারতায় করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে 

উদগ্র বাসনা




Friday, 13 October 2023

উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : প্রচ্ছদ

প্রচ্ছদ : সুজয়া মাম্পি   সম্পূর্ণ অলংকরণ : দেবশ্রী দে 





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : সম্পূর্ণ সূচি

 











উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : সম্পাদকীয় নয় কিন্তু ,অভিজিৎ দাস কর্মকার

 


সম্পাদকীয় নয় কিন্তু 
অভিজিৎ দাস কর্মকার 



প্রতি বছরই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে এই পত্রিকার শারদ সংখ্যা অনলাইন করে থাকি।এবছর মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ ৬ষ্ঠ বর্ষে পা দিলো।আপনাদের ভালোবাসায়। প্রতিবছর একই কবির লেখা রাখা সম্ভব হয় না এবং আমারও ঠিক পছন্দ নয়। তাই সব বছরই নতুন কবির লেখা আমন্ত্রণ করি। একদম নতুন তাকেও লিখতে বলি, আবার যিনি বহুবছর সাহিত্য যাপনে স্বতন্ত্র, তাঁর লেখাও আমন্ত্রিত থাকে। এবছর প্রচ্ছদ করেছেন ( অর্থমূল নেননি।আমিও দিতেও পারিনি) , চিত্রশিল্পী সুজয়া মাম্পি এবং পত্রিকার সমস্ত ইলাসট্রেশন করেছেন ( অর্থমূল্য নেননি, আমি দিতেও পারিনি) কবি দেবশ্রী দে। তাঁদের জন্য রইল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। পুরো পত্রিকাটি সম্পূর্ণ ৪৩-৪৪ জনের লেখা নিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। সকলে পড়ুন, মতামত দিন এবং অবশ্য অবশ্যই নিজেদের লিংক শেয়ার করুন। স্ক্রিনশট দেবেন না, কারণ আপনার লিংক খুলে পড়ার ভিউটিই আমাদের পরিশ্রমের মূল্যায়ন করে থাকে।





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , চন্দ্রদীপা সেনশর্মা

 


যোগাযোগ
চন্দ্রদীপা সেনশর্মা



সন্ধের মুখে বৃষ্টি হল সামান্যই
ভেজা সময় ভেজা শ্যাম-কল্যাণ
যাকে ফিরিয়ে দেওয়া গেছে দান
তার আগুনে ভিজে চলেছে সরগম

গাড়ি স্টার্ট দিলে চোখ নিদ্রাতুর
জোর করে খুলে রাখা
গাড়ির কাচে বিন্দু বিন্দু জল ঘুঙুর

যে মেয়েটি সীমানা পেরিয়েছিল অন্যভাবে
তাকে আগুন দিয়েছে কোল

গাড়ি পৌঁছেছে নির্দিষ্ট সীমারেখায়
সন্ধে ডুবে গেছে রাতে
আলাপ বন্দিশে রাগ যোগ





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , পল্লববরন পাল

 



 ৬০

পল্লববরন পাল

 

অভিমানতোর নাম         রাখলাম জুঁই
বিছ্নায় আয়তোকে        জাপটিয়ে শুই
কোথায় বিছ্না – ধ্যুস্‌       ঘরই নেই কোনো
বাঁধবার ইচ্ছেও                  হয়নি কখনো
 
আমার ঘরের নাম             ফুলের বাগান
পূর্বপুরুষ-নারী
স্নেহ আশ্রয়কারী               
শতশত জুঁইগাছ               যেখানে লাগান

জন্মান্তরবাদ                     মানিস কি তুই?
নইলে দুজনে দুই
হাতে নিয়ে চারা জুঁই          চল্ বগটুই 
ভস্মের কান্নাকে                 অভিমানে ছুঁই




উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , এলা বসু

 



দোসর 
এলা বসু


একটি অন্ধ মানুষ ও
একটি অন্ধকার ঘর
পরস্পর পরস্পরের
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে

একটি বেদনাহত জোনাকি
জ্বালিয়ে গেলো ওদের মাঝখানে
কয়েক বিন্দু অপলক আলো
ওরা অপচয় ভেবে নষ্ট করে ফেলেছে

ঝিঁঝি পোকার ডাকের মধ্যে ডুব দিয়ে
ওরা একে অপরকে বলে ওঠে
বিপদ সীমার দুইপাশে
একদিন আমরা 
দুঃসাহসের মতন জেগেছিলাম





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , পিয়াংকী

 



আরোগ্য 
পিয়াংকী 


এখন সময়, বিরোধী পক্ষের নৌকায় গাঙুর অবধি পৌঁছনোর 
চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ হয়েছে কয়েক কোদাল মাটি 
আস্তানায় রক্তের ঘাটতি ছড়িয়ে যাচ্ছে এত দ্রুত যে...
উভচর-পালক ঘুরেফিরে ফের... 
পাঁজরের সাতাশ নম্বর হাড়ে কিছুটা পানের পিক
আর বাউলের কপাল জুড়ে বৈরাগী মিছিল 

এসে পৌঁছলো গ্রহণ সমাচার। ঘরে উল্কাপাত, নির্ভুল দাবার ছক
ওয়াইনের গ্লাসে ধ্যানের দাগ 
তুমি চিনিয়েছিলে আহত বিড়ালের ঘর

ভিড় জমাতে এখানে কেউ আসে না 
ব্যস্ত আতসকাচে শুধু বৃষ্টির হিসেব। প্রায় সকলেই নক্ষত্রযাত্রী 





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , কিংশুক চক্রবর্তী

 


ঘোলা জল নদী 

কিংশুক চক্রবর্তী



ঘোলা জলের নদী! 


পুণ্যস্নানে বোধ ছিল গায়ের কাপড়ের মতো। 

ফল্গুর ভাষা নিয়ে যেতে পারেনি আমাদের 

                                   বোধিবৃক্ষের নীচে


সারিতে প্রতীক্ষায় শব্দের পূজারী 

ঠেস দিয়ে মন্দিরের দেওয়ালে;  

সমীক্ষার উপকরণে ভরে যায় ডালা


বেদিতে ছড়ানো ফল;

নরম শাঁস আর খোলসে তৃপ্ত চড়ুইয়ের ঠোঁট  

খুঁটে খেলে বীজ -


                     যন্ত্রণাটুকু উঠে আসে শুধু 

আর প্রতিরোধ


স্বত্ব আমাদের, আরও গভীরের অন্ধকারে 

রেখে আসা অধিকারের 

                                         ঘোলা জল নদী!