Friday, 13 October 2023

উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : অণুগল্প , দেবারতি দাস

 


ভালোবাসা চির অম্লান
দেবারতি দাস


টেবিলে ফল কেটে রাখা। সারা দুপুর উনকিপোকা উড়ছে তাতে। পাশ ফিরে সুয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে আছেন সুপর্বা। ছেলে, বউ আর ছোট্ট নাতি সোমু এসে ঘুরে গেছে পুজোয়। আবার বারোটা মাস!....

মণীন্দ্র গুপ্তের অক্ষয় মালবেরিটা আজ শেষ করবেন ভেবেছিলেন দীপেন্দু। ড্রইঙে বসে চোখটা লেগে গিয়েছিলো তাঁর। ভোরে নিয়মিত হাঁটা, বাজারের নেশা, ফিরে এসে স্নান-খাওয়া, বিকেলে সমবয়সী আড্ডা তারপর বই আর খবরের চ্যানেল -- এইসবের মধ্যে দিয়েই অবসর দিব্যি কেটে যাচ্ছে দীপেন্দুর.. কিন্তু যৌবনের উচ্ছ্বসিত সুপর্বা মোহনায় এসে বড়ো শান্ত, নিস্তরঙ্গ, উদাসীন।....

দীপেন্দু ও সুপর্বার একমাত্র ছেলে নীলেন্দু লন্ডনে সেটেল্ড্। তিন বছরের নাতি সুপর্বার কোলের বদলে বেড়ে উঠছে বিদেশে। ভিডিও কলে ওদের প্রি স্কুলের প্রোগ্রাম দেখেছেন সুপর্বা। সাদা সাদা বাচ্চাগুলোর মধ্যে একেবারে মিশে গেছে ওনাদের সোমু, সৌমেন্দু দত্ত, দত্তদের বংশ প্রদীপ। সোমুর জন্ম ওই দেশেই। সেই সময়ে বউমা তনিমার মা ওখানে ছিলেন প্রায় ছয় মাস। সুপর্বা এরোপ্লেনে অতক্ষণ কিছুতেই বসতে পারবেন না। বহুবার টিকিট কেটেও শেষ পর্যন্ত ওনার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সুপর্বাকে একা রেখে দীপেন্দুও ছেলে-বউমার সংসার দেখতে যেতে পারেননি। সোমুর দুই বছর বয়সে ওঁরা দেশে আসেন, আবার এইবার পুজোয়। নতুনভাবে পুজোর দিন গোনার এই বয়সে এসেও একটা কারণ পেয়েছেন সুপর্বা, নামের মতোই তাঁর বেঁচে থাকাটাও অর্থবহ হয়ে ওঠে বছরের ওই কটা দিন।....

দীপেন্দু ধীরে ধীরে শোয়ার ঘরে যান। চিরকালীন জ্যাসমিন তেল আর বোরোলিনের গন্ধ মিলেমিশে সুপর্বার চির পরিচিত ঘ্রাণ। বড়ো ভালো নাচতেন সুপর্বা। আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে চল্লিশ বছর আগে কলেজের রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠান -- "গহন স্বপন কুঞ্জ মাঝে" নাচের তালে সুপর্বা আর বেতাল দীপেন্দুর মন!....

এগিয়ে গিয়ে সুপর্বার মাথার কাছে বসেন দীপেন্দু। "যাবে আজ? গঙ্গার ধারে গিয়ে বসি, আরও একটা সূর্যাস্তের সাক্ষী থাকি দুজনে"। কলেজের দিনগুলো থেকেই দীপেন্দু জানেন, সুপর্বার বড়ো ভালো লাগে গঙ্গার ঘাট, সূর্যাস্তের রঙ।.... পাশ ফিরতে গিয়েও কেমন যেন অনিচ্ছা ঘিরে ধরলো তাঁকে। হাঁটুর ব্যথাটা বেড়েছে। আবার শাড়ি ছাড়া, সাজগোজ যেইটুকু না করলেই নয়।.... দীপেন্দু এবার উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটা হালকা গোলাপি রঙের বাটিকের শাড়ি বের করে দিলেন.. "এই রঙের আমারও একটা পাঞ্জাবি আছে না?".... সুপর্বা আর তাঁকে নিরুৎসাহিত করলেন না। খাট থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন অ্যাটাচড্ বাথরুমের দিকে।.... 

গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে এলো চুলে লাল টিপ পরে সন্ধ্যা এসে দাঁড়ায়, এপারে দীপেন্দু আর সুপর্বা পাশাপাশি বসে চেয়ে আছেন সেই দিকে, মাঝের নদীটা বয়ে চলেছে চেনা ছন্দে।.... সুপর্বার লম্বা আঙুলগুলো বড়ো ভালো লাগে দীপেন্দুর। সেই আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, -- "এই সন্ধ্যা, এই চিরপ্রবাহী নদী, ওই আগুন রঙা দিগন্তকে সাক্ষী রেখে বলছি, জীবনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমার প্রতিটা দিন এভাবেই, তোমার পাশে বসে, তোমার হাতে হাত রেখে, তোমায় ভীষণ ভালোবেসে কাটবে।.... সুপর্বা, ভালোবাসবে আমায়?"....





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : মুক্তগদ্য, উৎপল চক্রবর্তী

 



ক্যারাটে মূলত আত্মরক্ষা ও সমাজ চেতনা নয়…
উৎপল চক্রবর্তী


‘’অন্যের কথা শুনে আপনি যা শিখেছেন ,তা আপনি খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যাবেন ………নিজের শারীরিক
পরিশ্রম দিয়ে যা শিখেছেন ,তা আপনি সারা জীবন মনে রাখবেন।‘’ – মাস্টার গিচিন ফুনাকসি।
ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বোধি ধর্মা প্রথমে যোগা এবং মল্লযুদ্ধ মিশ্রিত করে মার্শাল আর্টসের প্রচলন করেন। মূলত আত্মরক্ষার জন্যই এই মার্শাল আর্টসের সৃষ্টি হয়। তারই বিভিন্ন অঙ্গ হল জুডো, ক্যারাটে ডো , কুংফু , জুজুৎসু ,কেঞ্জুৎসু , কবু ডো ।

 ক্যারাটে শুধু আত্মরক্ষা করতেই শেখায়না,একই সঙ্গে আত্মপরিচয় ,শৃঙ্খলা বোধ এবং যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি তে অবিচলিত থাকার মনোভাব তৈরিতে সাহায্য করে । ক্যারাটে মানে শুধু খালি হাতে টালি ভাঙা বা বরফে র চাঁই ভাঙা নয়, ক্যারাটে শেখায় অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকে দৈহিক এবং মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটানো ।

   ক্যারাটে শেখানোর ক্ষেত্রে সবথেকে কঠিন কাজ হোল, এই শিল্পের নৈতিক দিকগুলিতে বিশ্বাস জাগানো । বেশিরভাগ শিক্ষার্থী লড়াইয়ের কৌশলগুলির তাৎক্ষনিক ফলাফলে আগ্রহী এবং এর নৈতিকতা বিষয়ে যত্ন নেয়না । তাহলে আমরা কি সেই শিল্পের অনুশীলন করছি ,যা মানুষকে ধ্বংস করতে সক্ষম ! তাহলে কিভাবে একই সঙ্গে লড়াইয়ের কৌশল শেখানো ও নৈতিকতা জাগ্রত করা যায় ! তার উত্তর পাওয়া যায় ক্যারাটের হৃদই কাতাতে । কাতা বলতে বোঝায় শরীর ও মনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং এটি কেবল ধারণা ও বৌদ্ধিক আত্মরক্ষার জন্য নয় , প্রকৃত পক্ষে কাতাকে বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত করাই হল কাতার আসল উদ্দেশ্য ।
    
    কাতার ভিত্তি হলো “কারাতে নি সেন্তে নাসি” , এই ধারণাটির মূল আক্ষরিক অর্থ অনুবাদ করলে দাঁড়ায় --- কোনো ব্যক্তি প্রথমেই কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয় না , সমস্ত ‘কাতা’ প্রতিরক্ষা দিয়েই আরম্ভ হয় এবং এই বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে যে সত্যিকারে র ক্যারাটেকা কখনোই প্রথমে এবং অপ্রাসঙ্গিক ভাবে উত্তেজিত হয়ে কাউকে আঘাত করবেনা । 

     ক্যারাটে ডো মন ও দেহের ইতিবাচক বিকাশের ওপর জোর দেয় ।প্রত্যেক ছাত্রকে অবশ্যই তার শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে তার বিকাশ করতে হবে । তাকে অবশ্যই ক্যারাটে ডো সম্পর্কে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ভালোভাবে অর্জন করতে হবে এবং নিজের সবলতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তারপর তাকে অবশ্যই দুর্বলতা গুলি সংশোধন করতে হবে এবং নিজের সবলতার জায়গাগুলির ওপর ভিত্তি করে নিজের উন্নতি করতে হবে।

   ক্যারাটে বা যে কোনো শারীরিক শিল্পের ( মার্শাল আর্ট ) অনেক উপকারী দিক
আছে – যেমন – কার্ডিও ভাসকুলার ফিটনেসে বৃদ্ধি, পেশী ( মাসেল ফিটনেস) শক্তিশালী করা,লক্ষ্য ও
মনোযোগের বিকাশ,আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ।

    অবশ্য এগুলো শুধু মাত্র মার্শাল আর্ট নয় , যে কোনো আ্যথলেটিক ধরণের খেলাধূলা করলেই হয় । বিশেষত মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের সুবিধা হল, নিজেকে রক্ষা করার কৌশল শেখা। শারীরিক সংঘাতের ভয় ও আঘাত এড়াতে শেখা,নিজের শারীরিক ও মানসিক সীমারেখা কে বাড়িয়ে তোলা,সচেতনতার
বিকাশ করা , যাতে যে কোনো পরিস্থিতিতে মনকে শান্ত রাখা যায় ।

মেয়েদের প্রায়শই শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। মার্শাল আর্ট লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলকে মার্শাল আর্টিস্ট হতে শেখায়। মেয়েরা শারীরিক আক্রমণ এড়ানোর ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখার ফলে তাদের নির্ভীক মানসিকতার বিকাশ হয় । ক্যারাটে প্রশিক্ষণের বহুবিধ সুবিধা। তবে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কটি সুবিধা হল ,নিজের ক্ষতি না করে কিভাবে সঠিক আঘাত করা যায় ,স্ট্রাইকের সময় কিভাবে শক্তি উৎপন্ন করা যায় ,গতি এবং ভারসাম্যের বিকাশ করা যায় কিভাবে ---- তা শেখা।





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : মুক্তগদ্য, রঞ্জনা ভট্টাচার্য

 


কোনো এক গোধূলি বেলায়

রঞ্জনা ভট্টাচার্য 


শুকনো ঘামের গন্ধ আর ধূলোট নাভি  নিয়ে দিবাকর রক্তের ছোপ ধরা মেঘের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে নিচে। এইসময় নির্জন হয়ে যাই। কোলাহলে ভুগে  ভুগে আমি বিষণ্ণ। ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে হুঁস করে চলে যাওয়া গাড়ি, বহুতল বাড়ির বারান্দা -বাগান দূর থেকে রূপকথা মনে হয়। আমার  মধ্যমেধার হাত থেকে অক্ষরেরা পিছলে চলে যায়, তাকে বলি তোমার সিন্দুকের চাবি পেলে সিন্দবাদ হয়ে যাব। কোনো এক নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে এরোপ্লেন উড়ে চলে যায়  উৎকণ্ঠা নিয়ে । তাকে চলে যেতে দেখে মনে হয় আমার কোনো উড়ান নেই। বুকের ভেতর কথা জমে জমে পাথর।কলম নিয়ে বসলেই তারা কেমন যেন বাষ্পের মতো উড়ে যায় ঐ এরোপ্লেনটার কাছে,ওর পেটের ভিতরে উৎকন্ঠার পাশে উবু হয়ে বসে আর ঝিমোয়। কলম ধমক দেয়,'বিরক্ত লাগে।সাদা পাতার উপর অকেজো আমাকে বসিয়ে রেখেছ।না পারলে লিখো না। তুমি না লিখলেও জগতের কোনো ক্ষতি নেই। আমাকে রেহাই দাও।'
আমি না লিখলে সত্যিই তো‌ এই জগতের কিছু যায় আসেনা। আমি কি জগতের জন্য লিখি?এই জগতের জন্য  তো কেয়ারি করা বাগান,ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন  নয়। এগুলো সবই মানুষের জন্য। এই জগতের জন্য সমুদ্রের নুন আর ঘাম, একরোখা পাহাড় ,  অকারণে উৎফুল্ল ঝর্ণা । আমি কী তাদের 
জিজ্ঞাসা করব আমার লেখায় কিছু 
 যায় আসে কিনা! ঐ যে একটু ঝুঁকে পড়া খেজুর গাছ ও আমার অস্পষ্ট কবিতা  শুনবে?
  কবিতাগুলিকে তালুর উপর রেখে উল্টেপাল্টে দেখবে ওপাশের একটেঁরে মাঠ। ঢ্যাঙা তালগাছ হয়তো মাথা নাড়বে কিচ্ছুটি হয়নি ,একদম মিনিংলেস। অক্ষরেরা একটু একটু করে কুঁকড়ে যাবে ,ওদের গলা শুকিয়ে কাঠ।অ মানে' অত্যাচার' না অ মানে' অপসারণ '...অ নিজেকে অজগরের পেট থেকে একবার করে বার করবে, অজগর বিলক্ষণ আবার তাকে গিলে ফেলবে ।  আ তে যে 'আমি' তাকে দেখে বিস্মিত হইনি কোনোদিন? আমার ভিতরে লুকনো ঈর্ষা আর দ্বেষ,লোভ আর তামাসা চমকে দিয়েছে বারবার,আর ভেবেছি আমি বুঝি এরকম ! আমি এরকম? নিজেকে ভালবাসতে গিয়েও তো কখনও ভালবাসা ছিটকে বেরিয়ে গেছে তিরবিদ্ধ হরিণীর মতো। ভালবাসা পুরুষ না নারী এই ভাবনায় শিহরিত হয়েছি কতবার!
  আমি এক গাঢ় আমি'তে  বুঁদ হয়ে আছি। আমার ভিতরের আমি কি বাইরের আমিকে দেখে বিস্মিত হয় না বিপন্ন বোধ করে ? নাকি সে শুধুই সাক্ষী? তার দেখে যাওয়া ছাড়া কোন কাজ নেই।সারা গায়ে আমির ফোঁড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে অবয়ব তার থেকে সাক্ষী আমির মুক্তি আছে কিনা কে জানে?
  আমি যে আমার বন্ধু হয়ে উঠতে পারিনিএকথা দুঃখ জানে বলেই প্রতিবেশীর মতো আড়ি পেতে থাকে; ফিসফিস করে কিছু কথা নিজেকে বলতে গেলেই টের পাই, সবটা বলে উঠতে পারছি না। উচ্চারিত কথা  আর অনুচ্চারিত কথার মধ্যে দিয়ে ফায়ার এঞ্জিন চলে যায়। অনিশ্চয়তার আগুন নেভাতে গিয়ে কতবার স্নায়ুর মধ্যে অন্ধকার হয়ে যায়। মুহূর্তে কোনো গ্যালোপিং ট্রেন চলে যায় আলোর ঝলকানি তুলে।
  যতটুকু মানায় ততটুকু দিয়েই আমি তৈরি, তবুও কেন যে সবার থেকে একটু করে টুকে নিয়ে নিজেকে বেঢপ বানাই!আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় কিছুটা 'নিয়তি',কিছুটা 'বৃষ্টি', কিছুটা 'কুয়াশা', কিছুটা 'সান্নাটা',কিছুটা'পতঝর'- নিয়ে তৈরি আমি আমার থেকে একটু দূরে 'তুমি'র কাছে, তুমি'র থেকে একটু দূরে 'আপনি'র কাছে....
  আয়নাকে জিজ্ঞাসা করি,'আপনি কী চান?'
  আয়না নিরুত্তর...





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : মুক্তগদ্য, সুকোমল কান্তি দাশ

 



বিভাজন
সুকোমল কান্তি দাশ


বিক্রম কে পাড়াতে বিকি বলেই ডাকতো। কলকাতা থেকে ৪০ কিমি দূরের এক মফস্ সল শহর বারুইপুরে বেড়ে ওঠা তার। বাবা কাজ করতেন রেল ওয়েজে। মধ্যম মানের চাকরি। বিকির পড়াশুনো স্কটিশ চার্চ কলেজ, আর  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ। 

  বাবা, ঠাকুরদা'রা দেশভাগের সময় এসেছিলেন ওপার বাংলা থেকে।  সাম্প্রদায়িক মুসলমানদের অত্যাচারের গল্প বাবার কাছে শুনে বিকির মনে কিছুটা হলেও যে মুসলিম বিদ্বেষ আসেনি তা নয়। বিশেষত এপারে আসার পথে কিভাবে মুসলিম দুষ্কৃতিরা বড় পিসিকে ধর্ষন আর  খুন করে, লুঠ হয়ে যায় সর্বস্ব; এসব শুনলেই বিকির মাড়ি শক্ত হয়ে যেতো। হাতের কব্জির শিরা ফুলে উঠতো। 

  বাবার কাছে যখন শুনতো বরিশালের পাতারহাটের গ্রামের জমিতে লকলকে সোনালি রুপশাল ধানের কথা। দেঊড়ির পুকুরের কালবোস মাছের কথা। তখন দেখতো বাবার চোখের কোণগুলো অনন্তের নীরবিন্দুতে ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু নির্মোহ হয়ে ঝরে পড়ছেনা। তখন বিকির  অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের উদ্বাস্তু কবিতার সেই লাইনগুলো মনে পড়ে যেতো--"হিজল গাছের ফুল  টুপ টুপ করে এখনো পড়ছে জলের উপর, বলছে যাবে কোথায়? একটু দুরেই কালো মেঘের মতো ধান হয়েছে, লক্ষীবিলাস ধান.."!  সেই সোনার দেশ ছেড়ে পিতামহের উদ্বাস্তু হবার নিদান যারা দিয়েছিলো তাদের প্রতি বিকির চরম ঘৃণা ফুটতো টগবগ করে। কিন্তু পরক্ষণেই যখন ভেসে উঠতো পার্টির লোকাল সেক্রেটারি তোফাজ্জল কাকুর মেয়ে মহসিনার কথা। ভেসে ওঠে তার মামা বাড়ির পাশে পুরানো গীর্জের পিছনে বড়দিনের সেই রাতের কথা -- একটি ১৯ বছর বয়সী ছেলে একটি ১৮ বছরের মেয়ের বুকে যখন পৌর্ণমাসির চাঁদ দেখলো তার জ্যোৎস্নায় পুড়লো, উপতক্যায় হেঁটে বেড়ালো তার কামুক অনুভূতিরা রূপোলি নদীতে ডুব দিলো তার পরমব্রহ্ম তখন বুঝেছিল যৌবন, যৌনতা ধর্মনিরপেক্ষ।  কিন্তু তসলিমা নাসরিনের লজ্জা উপন্যাসের নায়কের বাবার মতো বিকির সম্পর্ক মহসিনার সাথে গড়ায়নি। 
তারপর পুলিশের চাকরি করতে এসে স্ববিরোধী দুটি স্মৃতি নিয়ে বিকির দিন কাটছিলো। 
 

  হুগলির এই থানায় ওসি হিসাবে দায়িত্ব খুব বেশিদিন সে নেয়নি। রুটিন আকারে তাকে অংশ নিতে হতো শান্তি সভায়, হিন্দু বা মুসলমানদের উৎসবের প্রাক্কালে। সেবার ছিলো কালী পূজার প্রাক্কালে শান্তি সভা। দিনটি ছিলো লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন বিকেলে। পূজাকমিটির লোকজন, নেতা, নাকড়ি, মাওলানা, ইমাম, বিডিও,  বিদ্যুৎ পর্ষদের লোকজন, গন্যি মান্যিরা সব এলেন। কেউ গীতা থেকে উদ্ধৃতি দিলেন, কেউ কোরান থেকে। বিকি শান্তি রক্ষার্থে কি করনীয় তাই বললো। মিটিং শেষ হয়ে গেলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সবাই একে একে চলে গেলো। জয়দেবপুর এর সাত্তার মিঞা বললেন,"বড়বাবু এক কাপ চা খাওয়া যাবে?" বিকি বললো, " আসুন অফিসে আসুন!" চায়ের অর্ডার নিয়ে গেলো হোমগার্ড। সাত্তার বড়বাবুর অফিস চেম্বারে ঢুকলেন। 

সাত্তার ৬০/৬২ বছরের এক ছোট্ট খাটো মানুষ। কালো রং। সাদা দাড়ি আছে। তবে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মতো নয়। পরনে সব সময়কার সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি।  কমিউনিস্ট পার্টি করেন। পেশা চাষবাস। আলুর সময় আলু ফলান,ধানের সময় ধান, বাড়তি শস্য হিসাবে সরষে উঠে আসে। 
 
চা এলো।  খেতে খেতে অনেক গল্প শুরু করলেন -- রাজ্য,রাজনীতি, ধর্ম ইত্যাদি। চা যখন শেষ হবার মুখে, গল্প যখন জমে উঠেছে তখন সাত্তার বললেন, " যাই বড়বাবু, অনেক কাজ আছে!" বিকি জিজ্ঞেস  করলো, "কি এমন কাজ?" সাত্তার বললো, " আগামীকাল লক্ষ্মীপুজো। পুজোর বাজার করতে হবে।"
বিকি বললো," আপনার আবার কিসের লক্ষ্মীপুজো?"
সাত্তার উঠতে গিয়েও চেয়ারে বসে পড়লেন। বললেন," একটা সিগারেট দিন। টানি। আর বলি কিসের পুজো!"
সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, " সে অনেক কাল আগের কথা।  আমি তখন পেশাদার যাত্রাপালা করতাম। অম্বিকা অপেরায়। চিৎপুরে। মূলত চরিত্রাভিনয় আর যাত্রাপালায় বিবেকের ভূমিকায় থাকতো রনদেব সরকার ওরফে রানা। ভারী মিষ্টি আর উদাত্ত গলা ছিলো তার। আমার দলে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আমাদের পাশের গ্রামেই বাড়ি।" সাত্তার দম নিয়ে আর একবার সিগারেটে টান দিলেন। বিকি বললো, "তা সেই বন্ধুর বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর বাজার করবেন?" সাত্তার ঘাড় নাড়িয়ে বললেন, " না না বড়বাবু। হলো কি, আমি একবার ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়লাম।  যমে মানুষে টানাটানি।  রানা একবিঘে জমি বেচে আমাকে ভেলোর নিয়ে সুস্থ করে তুললো। বন্ধুত্ব আরও নিবিড়তর  হলো। ও বললো বন্ধুত্ব স্থায়ী করা দরকার। আমি তাই ভাবলাম।  রানা প্রস্তাব দিলো ওর ছেলের সাথে যদি আমার মেয়ের বিয়ে দিই। প্রথমে আমার আত্মীয় স্বজন,  সম্প্রদায়ের প্রবল আপত্তি ছিলো। ওরা কায়স্থ। ওদের কূলদেবতার নিত্য পুজো হয়। ওদের বাড়ি থেকেও আপত্তি ছিলো। কিন্তু আমরা দুজন মানিনি।"
বিকি একরাশ বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো সাত্তারের দিকে! ভাবলো এ ও হয়? তারপর বললো," তারপর কি হলো?" 
সাত্তার বলতে থাকলেন," তারপর ছেলেমেয়েরা রাজি হলো। আমি কালো কুৎসিত  হলে কি হবে আমার মেয়ে কে দেখলে আসমানের হুর মনে হবে। তারপর জেলা সদরে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হলো। পরে খাওয়া দাওয়া। অনেক নিমন্ত্রিতরাই আসেনি। পার্টির লোকজনের অনেকেই আসেনি। ভোট হারানোর ভয়ে। কিন্তু তাতে আমার বা রানার কিছুই যায় আসেনি। এখন মেয়ের ঘরে আমার দুই ফুটফুটে নাতি-- কবীর আর লালন। এরমধ্যে রানা হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে মারা গেলো দুবছর আগে। আজ মেয়ে খবর দিয়ে পাঠালো লক্ষ্মীপুজোর দশকর্মা আর প্রসাদের ফল, বাজার করে নিয়ে আসতে।  তাই আজ পুজোর বাজার করে মেয়ের বাড়ি পৌঁছাতে হবে! বড়বাবু যাই।"
শুনতে শুনতে বিকি দেশভাগের গল্প,  মুসলিম বিদ্বেষ,  মহসীনা, সাত্তার মিঞাকে গুলিয়ে ফেললো। ভাবলো এটাই বাঙলা, এটাই ভারতবর্ষ।



উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : মুক্তগদ্য, সৌমী দাস

 


বুলা মুখোপাধ্যায় ( তথ্যসূত্র)
 সৌমী দাস


নাম-না জানা হলদে আঁচল গোধূলির আগমনে নিজেকে গোটালেই একরঙা সন্ধ্যামণি বিছিয়ে দেয় নিজের আঁচল। এদের দু'জনকে পরম ভালোবাসায় সিক্ত করে ইতিহাসের মাটিকে আঁকড়ে ধরে যে, সে গৈরিকাভ রঙ্গন। ওরা দোলায় ঐতিহ্যের চামর।

বেশ সম্ভ্রমপূর্ণ দৃষ্টি ছিল গ্রামের মানুষের তাঁর প্রতি। গ্রামে যাতায়াতের সুবাদে বিদ্যানুরাগের আভিজাত্যে তিনি সাধারণ ব্রাহ্মণ পরিবারগুলির কাছে ছিলেন নমস্য। মুখোপাধ্যায় পরিবারের জীবনে ছিল মেঠো সুর। এত গাছ-গাছালির জীবনে পোষ্যরাও ছিল সুখে-শান্তিতে। ঘরে সিন্দুকের ব্যবহার ছিল না, ওসব ছিল রাজা-রাজরার ব্যাপার। পুঁথি কিছু ুএকটা হাতে এল বটে। রোজকার কাজের জিনিস তো নয়! তাই, স্থান পেল মাচায়।

মাচা আজ চাক্ষুষ করার সুযোগ নেই।কিন্তু, নিজের অজ্ঞাতে গোয়ালঘরের মাচায় সেদিন তুলে রেখেছিলেন যে পুঁথি, পঞ্চদশ শতাব্দীর বাংলা আখ্যায়িকা কাব্যের তা হল প্রথম নিদর্শন। দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের অযাচিত সম্পদটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটাল বসন্তরঞ্জন রায়ের হাত ধরে।

দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের তৃতীয় প্রজন্মের আজ কংক্রিটের বসতভিটে। কিন্তু, ছাদে তারাও ওঠেনি। শ্বশুরমশাই হারাধন মুখোপাধ্যায় মজ্জাগত করে দিয়েছেন যে শিক্ষা, তা হল, ইতিহাসের পাঁচিল ভেঙে কখনো ভবিষ্যতের চূড়ায় ওঠা যায় না। তাঁর পৌত্র ব্যবসায়িক আদান-প্রদানে আজও বিকিয়ে দেয়নি পরম্পরার ছাঁচ।

লোকশ্রুতি, শ্রীনিবাস আচার্য্যের মধ্যমপুত্রের দৌহিত্রবংশ বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার কাঁকিলা গ্রাম নিবাসী মুখোপাধ্যায় পরিবার। আজও রীতি মেনে রাধারমণ ও রাধারাণী যুগলে আষাঢ়, কার্তিক ও ফাল্গুনের ১১-তে এই গ্রামজীবনের অঙ্গে অঙ্গে 'শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তনে'র প্রত্যুক্তিময় কাব্যসুধা পরিবেশন করে।






উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , সাধনা বিশ্বাস

 


থেমো না...
সাধনা বিশ্বাস 



কিছু প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়,
কিছু প্রয়োজন থেকে যায় চিরদিন।
যারা তোমার ভালবাসা, বিশ্বাস 
আর সরলতার স্নিগ্ধতাকে
 তোমার দুর্বলতা ভেবে,
 তোমাকে ব্যবহার করে,
 নিজেদের প্রয়োজনীয় আখের গুছিয়ে নিলো --
তুমি তাদের জন্য কষ্ট পেও না।
তারা তো প্রকৃত অর্থেই দীন।।

মানসিকতায় নিম্নগামী, অন্তরে যারা হীন 
অন্তঃসারশূন্য এই মানুষগুলো-
নিঃস্ব,রিক্ত আর হতদরিদ্রই থেকে যাবে চিরদিন।

তুমি কত ধনী ,কত মহান 
তুমিই তা করতে পারো প্রমাণ
সূর্য্য যেমন রোজই ওঠে,
প্রতিদিনই অস্ত যায়
কোনো প্রতিকূলতা তাকে আটকাতে পারে না
মাঝে মাঝে গ্রহণ লাগে 
তবে সূর্যের গতি শ্লথ হয়না 
তাই তো সূর্য মহান ।।

তুমিও সামনে এগিয়ে চলো
এদের জন্য থেমো না ।
বিশ্বাস করে ঠকে গেলে ,
সেখান থেকে শিক্ষা নাও ,
তবে বিশ্বাস করা ছেড়ো না।
হারের থেকে শিক্ষা নিয়ে
 যে নতুন করে শুরু করে,
জীবন তাকে ঠকায় না।

শেষ জীবনে , ব্যালেন্স শীটে দেখবে
 তুমি কখন যেন পৌঁছে গেছো শিখরে,
স্নিগ্ধ শীতল মিষ্টি হাওয়া
বইছে তোমার শরীরে।
ঠগবাজেরা পাদদেশেই 
ধুকছে জ্বরা ব্যাধিতে।



উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , সোমা ঘোষ

 



নিরাকার জোৎস্নায়
সোমা ঘোষ


কোন দেশেরই আপন নদী হয় না- 
এই আশ্চর্য প্রবাদে সব অলংকার খুলে ফেলছো স্বর্গাদপি গরীয়সী মহিমায়...

বড়ু চণ্ডীদাস নগর কীর্তন- 
ফুল পাখি চন্দ্র সূর্য প্রদক্ষিণ প্রত্যক্ষ গাঢ় চোখ নিজের দিকে ফিরলেই...

পুরনো শৃঙ্খল পুঁতে গন্তব্য চলে গেছে-
 তবু সুনিবিড় বাটোয়ারা মেঘ ভঙ্গিমায় 
দূরদর্শী ঘুম দশা... 

বিভাজনে শরীর চাপিয়ে নেয়- 
গৃহপালিত স্বপ্ন পোশাক নিরাকার জোৎস্নায় 
ঘন জ্বরের উপশমে বরফ গলা মায়ায়...




উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , মৌ গোস্বামী

 




জীবনমুখী
মৌ গোস্বামী


হিসেবের এক টুকরো কাগজ কখনো ভালোবেসেছে কলমের কালি ?
 সাদা শরীর ছুঁয়ে কত কথা চলে কলমের।
ভালোবাসার মধ্যেই থাকে অনেক কিছু ভালো। 

সন্দেহাতীত সম্পর্কের সূত্রপাত ঠিক যেখান থেকে , ঠিক সেখানেই 
বীজ বপন করে বেড়ে ওঠে অসংখ্য প্রেম,এক চিলতে অনুরাগ, ও 
অনেক অনেক অনুভূতি। 

তিল তিল করে তৈরী হওয়া সোহাগগুচ্ছ
 এভাবেই প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি ঠোঁটের কোণে কোণে হাসি হয়ে 
জীবনমুুুুখী গানের মতো ।




উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , আভা সরকার

 



আশ্রয়
আভা সরকার 


জলের বুকে অস্থিরতা নামলে---
সোজাসুজি নেমে আসা 
স্বচ্ছ আলোর পথও যায় বেঁকে 
আলগা হতে থাকে রঙিন বাঁধন !

কেঁপে ওঠা হাওয়া কেড়ে নেয় শংসাপত্র
প্রতিফলিত হতে গিয়ে ভেঙেচুরে যাই জলের গভীরে
---প্রতিনিয়ত !

স্থিরতা বলতে পড়ে থাকে সেই 
অনড় আকাশ--
একমাত্র আশ্রয় হয়ে !





উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , সৃশর্মিষ্ঠা

 



ভীষণ নকল
সৃশর্মিষ্ঠা 



ঠোঁটের আবডালে আমি,  ভীষণ একা
মনে পড়ে আমার স্ত্রী-সন্তান
আদর-আবদার

বাটারের চেয়ে মার্জারিন, 
কতটা নকল
প্রথম বুঝেছিলাম

সরে এলাম

তোমার ঠোঁট মার্জারিনের বিজ্ঞাপন
নির্জলা শহরের হোর্ডিং

আরও একা
দাঁড়কাকের স্বর...






উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , সুচরিতা চক্রবর্তী

 



রঙিন খোলস
সুচরিতা চক্রবর্তী 



একটু নিরিবিলি একাকী সন্ধ্যা যাপন
নন্দন চত্বর,  নিজেকে ভাবতে বসে দেখেছি,  
মিথ্যে রঙে রাঙানো মানুষের মুখ, মানুষের সুখ 

মানুষের দু:খ অসাবধানতায় গলে যাচ্ছে। 

বেরিয়ে আসছে নগ্নতা, ওরা 
বুঝতে পারছে না চিনতে পারছে না নিজেকে। 
জোড়াতালি দেওয়া জীবন শামুকের মতো চলে আসছে আমার খুব কাছে। 

ছুঁতে গেলেই লুকিয়ে ফেলছে মুখ।

তারপরে দেখলাম,  আমিও তো শামুক। 




উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , পাপড়ি গুহ নিয়োগী

 


গাছ

পাপড়ি গুহ নিয়োগী


 

বালিশভর্তি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভোর রাতে কান্না পেলে

গল্পের হাত ধরে বাকলে জড়িয়ে যাই

রোদেরও কষ্ট হয় পাতাহীন ডালে

 

পরিযায়ী ব্যাকুলতায়

পারফিউমকে মাঝে মাঝে গাছ বলে ডাকি




উৎসব সংখ্যা ১৪৩০ : কবিতা , সুমনা সেন গুঁই

 



আমি তোমার রাই
সুমনা সেন গুঁই


আমি কি সেই আয়ান ঘোষের বউ  !
আমি কি সেই নীলাম্বরী ঢেউ  !
আমি কি সেই রাসলীলার রাই  !
তবে তোকে সারাজীবন চাই  -
চাই - চাই - চাই  -
সাহস করে মনের ঘরে তোকে দিয়েছি ঠাঁই,
শুধু আমিই কেন দায়ী  ?
আমি হলেম সেই মোহনবাঁশির রাই |
আজ যে খুঁজি আতি পাতি -
কোথায় তারে পাই  ?
আমিই যে সেই নিধুবনের রাই  |

ফেলে গেলি আমায় কেন বৃন্দাবনের পথে  ?
কি দোষ ছিল ? ঠাঁই হলোনা তোর ঐ স্বর্ণরথে  !
এই ছিল তোর ভালোবাসা ? এই বুঝি তোর প্রেম  !
রাজকার্যের বাহানাতে সবই হারালেম  |
মনেও যে তোর পড়লোনাতো একটি বারো আর 
তোর ভাবের ঘরে ঠাঁই মিলেছে অনেক প্রেমিকার  |
নামের সাথে নাম জুড়েছিস ,এটাই শুধু পাওয়া ,
ভুল ছিল কি, সমাজ ভুলে তোকেই কেবল চাওয়া  !
পূজোর ঘরে ঠাঁই মিললো, মনের ঘরে কই  ?
জ্বালিয়ে আগুন অপূর্ণতায় উপেক্ষিত হই  |
তবু নিধুবনে সংগোপনে বাজলে মোহন বাঁশী 
ঘর সংসার সব ফেলে যে এক ছুট্টে আসি  |
কারন, তোকে বড্ড ভালোবাসি |

ফেলে গেলি সবকিছুকে, আমি যে দুঃছাই  ,
আমি কি সেই হোলিখেলার তোর সঙ্গী রাই  !
আমি কি সেই উথাল পাথাল প্রেমের জয়গান !
আমি কি তোর কালো দেহের আলোর উপাদান !
আমিই কি সেই শ্রীরাধিকা! আমি কি সেই রাই  ? 
অপেক্ষাতে ক্লান্ত আমি, আজো তোকে চাই -
চাই - চাই - চাই  |
আমি ই কি সেই নীলাম্বরী ঢেউ  ! 
কেন আমার পরিনতি জানল নাতো কেউ  |
                        


Friday, 14 April 2023

পয়লা বৈশাখ সংখ্যা | ১৪৩০, প্রচ্ছদ

 প্রচ্ছদ : অভিজিৎ দাস কর্মকার 






                                                     ***********************

সূচি 

প্রচ্ছদ/সূচি ,  সম্পাদকীয় নয় কিন্তু,  সূচি, চন্দ্রদীপা সেনশর্মা, রিতা মিত্র, শ্রীমহাদেব, রুমা তপাদার,  মহুয়া দাস, অন্তরা দাঁ, পারমিতা ভট্টাচার্য, দেবলীনা চক্রবর্তী,  পৌলমী ভট্টাচার্য ( অণুগল্প) ,  পিয়াংকী, কেতকী বসু, সৃশর্মিষ্ঠা, লীনা সাহা, নবনীতা ভট্টাচার্য,  সোমা দাস, নীলম সামন্ত,  রুনা দত্ত, রঞ্জনা বসু (অণুগল্প), তরুণ আঁকড়ে, সোমা ঘোষ, দেবযানী ভট্টাচার্য, অনসূয়া চন্দ্র ( অণুগল্প),  রূপক চট্টোপাধ্যায়, সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য চৌধুরী, অমিতাভ দাস, সুশান্ত সেন, শম্পা সাহা (অণুগল্প),  কৌশিক চক্রবর্তী, উৎপল দাস, বিধুরা ধর, পাপিয়া মণ্ডল


পয়লা বৈশাখ সংখ্যা | ১৪৩০, সম্পাদকীয় নয় কিন্তু

 


সম্পাদকীয় নয় কিন্তু : অভিজিৎ দাস কর্মকার 

গত ছয় বছর যাবৎ একনিষ্ঠতার সাথে, একাই আপনার এবং আমার উভয়ের কাজ করেছি। এ পত্রিকা আমার একার না, আপনারও।  অনেকেই আমাকে সাহায্য করবো বলে এসে, মনকষাকষি করে চলে গ্যাছে।আবার আমার নেওয়া ব্যক্তিও ভুল বুঝে, নিজের উষ্মা প্রকাশ করে চলে গ্যাছেন। আমি কিছু বলিনি, আমি শুধু শুনেছি। কোথাও তাঁরা আমাকে নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে থেমেছেন, আবার কেউ কেউ এখনো করে চলেছেন। আমার কিছু যায় আসে না,যেমনটি আগেও ছিল না। তবে বর্তমানে আমার সহযোগী সম্পাদক দুজন মন থেকেই আছেন। হয়তো আগামীতেও থাকবেন।

এই সংখ্যা থেকে

সম্পাদক : অভিজিৎ দাস কর্মকার 
সহ-সম্পাদক : রিতা মিত্র এবং দেবলীনা চক্রবর্তী 

পয়লা বৈশাখ সংখ্যা | ১৪৩০, চন্দ্রদীপা সেনশর্মা

 


মায়া : চন্দ্রদীপা সেনশর্মা


খুব যত্নে প্রতি রাতে গা থেকে খুলে রাখি আঁশ গন্ধ। একপাশ ফিরে শুয়ে থাকি। এক দুটো গল্প কবিতা বা নিছক শব্দ লেখার চেষ্টা করি। ঘুম আসে না, মধ্যরাতে পাশ ফিরতেই হয়। আঁশ গন্ধে ভরে ওঠে নিরুত্তর বিছানা। কখন যে ঘিরে ফেলে আমাকে। লোফালুফি করে। বিবসনা করে। সেতারে রাতের রাগ, তন্ত্রকারি অঙ্গে গৎ বাজতে থাকে।

ঘুমিয়ে পড়ি কখন। সকাল হয়। পাখিরা ওড়ে। কোমল রেখাবে ভোরের ভৈরব...



৫ মার্চ, ২০২৩, রাত ১০.৪৪