Monday, 9 May 2022

২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ নন্দিতা আচার্য

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   নন্দিতা আচার্য ||  গল্প



মধুর তুমি


সকালটা শুরু হল এই ভাবে। ডিং ডিং ডিং...। বেজেই চলেছে অ্যালার্ম। ঘরের ভেতর আধো অন্ধকার। হালকা আকাশি মশারি। সে ঘুমন্ত অবস্থাতেই কম্বলের ভেতর থেকে হাত বার করে অ্যালার্ম স্টপ করে। ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখে, লম্বা সিল্কের পর্দার ফাঁক দিয়ে ভারি ম্রিয়মান একটা আলো ঢুকছে। হত ক্লান্ত দুটো মশা তখনও মশারির চালে বসে হুল ফোটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। -ধেৎ! সে আবার কম্বল দিয়ে মাথা ঢাকে।
আর সমানে নিজেকে বলতে থাকে, আটটায় ওঠার জন্য কেউ অ্যালার্ম দেয়? এই মেয়েটা, বল্ বল্, কেউ অ্যালার্ম দেয়? এরপরেও তার কম্বল এক চিলতে সরেনা। কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করে না। অথচ শান্তিতে শুতেও পারেনা। অপরাধ বোধ খামচাতে থাকে। -‘মনে আছে কিছুদিন আগেও সাতটার সময় গিয়ে স্কুলের খাতায় সাইন করতিস?’ ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই সে রাগ করে।– যখন যেমন তখন তেমন ভাই। এখন আমি উঠতে পারছি না। বেশ করবো, ন’টা দশ’টা অব্দি ঘুমবো। না, ‘বেশ’ করাটা আর তার হল না। এবার ডোর বেল। ঘুমের মায়া জাল ছিন্ন করে তারস্বরে বাজতে থাকে। শম্পা! দু’মিনিটের মধ্যে না খুললে, শম্পা উল্টো দিকে হাঁটা মারবে। নাহ, এ ঘটনা কিছুতেই ঘটতে দেওয়া যাবে না। মনে প্রচুর জোর এনে এক ঝটকায় কম্বলের বাইরে এসে চাদর জড়িয়ে হুড়মুড় করে সে দরজা খুলতে দৌড়ল। এ কি, অ্যালার্ম কোথায়? এ তো তার এডিটর সায়নদার ফোন! সর্বনাশ, কপালে দুঃখ আছে। মোট তিনবার রিং করেছে। প্রতিবারই সে অ্যালার্ম ভেবে বন্ধ করে দিয়েছে। আদৌ সে কোন অ্যালার্ম দেয়ইনি। অ্যালার্ম সেট করতে ভুলেই গেছিল! সে কাঁপা হাতে রিং ব্যাক করে। টানা পৌনে তিন মিনিট ধরে প্রবল দাবড়ানি এবং ওর পক্ষ থেকে প্রচুর কাকুতি মিনতির পর কোনক্রমে অবস্থা সামাল দেওয়া যায়। ‘তাহলে কখন বেরচ্ছিস? অ্যাসাইনমেন্টটা কিন্তু তুই জোর করে নিয়েছিস।’ তা নিয়েছে। বাইরে গিয়ে কাজ করার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এবং কাজটাও

অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং। তবে এক্ষুনি বেরতে হবে, সেটা বোঝেনি। -‘তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোর না প্লিজ, আমি সব সামলে নেব। ব্যাগ গোছানই আছে। জাস্ট হাফেন আওয়ার।’

বাঁকুড়া তার এই প্রথম যাওয়া। আশেপাশের জায়গা গুলো সম্পর্কে নেটে আগে থেকেই একটু ঝালিয়ে নিয়েছিল। রোহন সম্পর্কেও দেখছিল। কোথায় কি কাজ করেছে, সে সব ছাড়া ব্যাক্তিগত তেমন কিছু তথ্য সেখানে নেই। ‘ হাই, আমি মহুল।’ নীল স্করপিওর সামনের সিটে বসা শ্যামলা ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে নড করলো। ঝাঁকড়া চুল, বড় চোখ, সিনেমার হিরোর মত চেহারা। রীতিমত সুপুরুষ! ভাবা যায়, সমাজের একদম নিচের তলা থেকে উঠে আসা এ ছেলেটি আজ বিখ্যাত ডান্সার! ‘আমি কিন্তু আপনার একটা ডিটেল ইন্টারভিউ করবো। কলকাতা থেকে ছুটে এসেছি এই ইন্টারভিউটার জন্যই।’ হাসি মুখে ছেলেটি আবার ঘাড় ফেরায়। -‘আপনি তো ফিল্মটার ওপরেও লিখছেন।’ ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আউট ডোরে এসেছি...তবে পাখির চোখ আপনার ওপর। হাঃ হাঃ, এমন ভাবে বললাম...প্লিজ, ডোন্ট মাইন্ড!’ ‘আয় অ্যাম অনারড ম্যাম!’ সে মাথা ঝাঁকায়, অমায়িক হাসে। যাদবপুর এইট বি থেকে গাড়িতে ওঠার পর গাড়ি কোথাও থামেনি। লাঞ্চ হয়নি। বাথরুম যাবারও দরকার। সামনে বর্ধমান আসছে। কিছু বলতে হল না, গাড়ি আপনিই ব্রেক দিল।
দুড়দাড় করে সবাই গাড়ি থেকে নেমে পরে। সায়নদা ফোন করে, ‘সব ঠিক আছে তো রে?’ মহুল ভেবেছিল, কার না কার সাথে গাড়ি শেয়ার করতে হবে। কিন্তু রোহন এবং সঙ্গে দুটো অতি লাজুক ছেলে ছাড়া এ গাড়িতে আর কেউই উঠলো না। তারা আবার চুপটি করে একদম পেছনের সিটে উঠে বসে আছে। মাঝের লম্বা সিটে মহুল একা। সায়নদা বলেছিল, ‘ওরা যত্ন করে নিয়ে যাবে।’ তবে এত যত্নেও অস্বস্তি হয়। দু’একবার

ডেকেওছে সে ওদের। তারা সেই লাজুক ভাবে মাথা নেড়ে জানিয়েছে, ওদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না।
বর্ধমানে পনেরো মিনিট লাঞ্চ ব্রেক। বলা যায়, লেট লাঞ্চ। এরপর রোহন এসে ওর পাশে মাঝের সিটে বসলো।– ‘শুনেছি ছোট বয়সেই আপনি মা বাবা কে হারিয়েছেন। সেখান থেকে আপনার এই এতটা জার্নি... আই মিন, আপনার এই সাকসেস, এ তো পুরো গল্পের মত! আমরা কি এখন একটু আধটু কথা শুরু করতে পারি?’ ‘বেশ তো, এতটা রাস্তা, কথা বলতে বলতে যাওয়া যেতেই পারে। আমি প্রথম বড় সুযোগটা পাই ন্যাশনাল চানেলে এক রিয়ালিটি শোয়ে। সত্যি সেই জার্নিটা ছিল স্বপ্নের মতই। খোলা আকাশের নিচে বড় হওয়া একটা ছেলে হঠাৎ করে হাজার হাজার ওয়াটের আলোর নিচে, এ তো রুপকথার গল্পই।’ মহুল রোহণের দিকে তাকিয়ে থাকে, ...কেমন একটা মায়া হয়। আর আবার সেই মনে হওয়াটা ফিরে আসে। কোথায় যেন সে দেখেছে ওকে! অর্ক শুনলেই বলতো, ‘দেখ গিয়ে তোমার হাজার হাজার ফেস বুক ফ্রেন্ডের মধ্যে ঢুকে বসা কোন ফ্রেন্ড। পাগল একটা!’ কথাটা খুব মিথ্যেও না। এ রকম আগেও হয়েছে। তবে এ ছেলেটা তো কখনই ওর ফেস বুক ফ্রেন্ড নয়! বেশ অনেক সেলিব্রিটিই তার ফেবু ফ্রেন্ড। এবং তাদের প্রত্যেকেই
ওর বেশ ভাল মনে আছে। সত্যি কথা বলতে কি, ফেস বুক তো লাস্ট কয়েক বছরের ব্যাপার। তার আগেও কারুকে কারুকে দেখে ওর মনে হত, খুব যেন চেনা। কেউ কেউ আইডেন্টিফায়েডও হত। হ্যাঁ, এ তো সেই বাবা-মা’র সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে দেখা হয়েছিল অথবা কাকাই এর সাথে সুমনের গান শুনতে গিয়ে কলামন্দিরে আলাপ হয়েছিল? কখনো আবার তার কারুকে মনে হত, বহুযুগ আগে দেখা, যেন পূর্ব জন্মের চেনা শোনা! সত্যি কী ক্ষ্যাপা সে! নাহঃ, এ ছেলেটার ক্ষেত্র আরও একটু অন্য রকম। একে যেন এ জীবনেরই কোন এক সময় সরণিতে অনেকটা বেশি করে দেখেছে। কেমন নীল কুয়াশায় মাখা সেই স্মৃতি। ধুস, সিরিয়াসলি এবার তাকে সাইকিয়াটিস্টের কাছে যেতে হবে। এরকম অদ্ভুত ‘চেনা চেনা লাগা’র রোগটাকে বাগে আনতে হবে। নিজেরই হাসি পেয়ে যায় তার। সত্যি সে বড় পাগল!

অর্ককে একবার ফোন করা দরকার। বেচারা জানেও না, ও আউট অফ স্টেশন হয়েছে। আসলে ও-ও একটা চালেঞ্জ নিয়ে জোর করে চলে এসেছে। অর্ক এখন সিঙ্গাপুরে, অফিসের কাজে। ফিরতে দিন সাতেক।কলকাতায় থাকলে ফট করে ওকে বাঁকুড়ার মত অ-জানা জায়গায়, অচেনা লোকজনের সঙ্গে কিছুতেই ছাড়ত না। তবে মহুলের ধারণা, বার কয়েক কায়দা করে বাইরের আসাইনমেন্ট গুলো ঠিকঠাক উতরে গেলে, অর্ক আর বাধা দেবেনা। বাঁকুড়ার সোনামুখী। পাশেই জঙ্গল। সন্ধ্যার মুখে গিয়ে পৌঁছল। হিহি করে দাঁত কাঁপানো ঠাণ্ডা। শুটিং তখন প্যাক আপ। আবার পরদিন ভোর সারে ছটায় কল টাইম। রোহণের
সঙ্গে টুকটাক অনেক কথাই হল। তবু মুল সুরটা ঠিক ধরা পড়লো না। ছোট্ট শহরতলি। পৌরসভার অতিথি নিবাসে থাকার ব্যাবস্থা। পর পর সব ঘর গুলোতেই শুটিং পার্টির লোকজন। সামনের ড্রাইভ ওয়েতে ছাউনির তলায় রান্নার বিরাট ব্যাবস্থা। হাঁড়ি-কড়া এবং রাঁধুনি-জোগাড়ের ব্যাস্ততা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, লোকজন
নেহাত কম আসেনি। বাইরের কোন এন্টারটেনমেন্ট এর ব্যাপার নেই। অতএব কাজ শেষে সবাই মিলে জমিয়ে আড্ডা। ঠাণ্ডাও পড়েছে জব্বর। একটু রেস্ট নিয়ে মহুল নেবে এল নিচে। উনুনের গনগণে আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে রোহন । হয়তো ওপরের ব্যালকনি থেকে ওকে দেখে, আরও বেশি করে নিচে নেমে আসার ইচ্ছে হল মহুলের। কাল শুটিং শুরু হলে ব্যাস্ততা বেড়ে যাবে। যতটা পারা যায় রোহণের সঙ্গে আজই কথা বলে আউট লাইনটা তৈরি করে ফেলতে হবে। ভাল করে স্টোরিটা নামাতে পারলে, একটা কাজের কাজ হবে। ‘কফি খাবেন?’ রোহন হাতের কফি কাপ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে। ‘দারুণ... সত্যি বলতে কি, ঠাণ্ডায় এই কফির কথাটাই ভাবছিলাম।’ জোগাড়ে ছেলেটা এক কাপ গরম কফি এনে হাতে ধরিয়ে দেয়। উনুনের পাশে দাঁড়িয়েই কফি খেতে খেতে সে বুঁদ হয়ে শোনে রোহণের জীবন কথা। সাকসেস নয়, স্ট্রাগেল এর কথা। সাকসেস তো সে নেটেই পেয়ে গেছে। এটাই হচ্ছে আউটডরে আসা এবং এতক্ষণ ধরে কথা বলার
অ্যাডভান্টেজ। আবেগ গুলো শেষ পর্যন্ত স্পিট আউট হয়-ই!

- ‘এক সময় খালি গায়ে দিন কেটেছে। এরকম শীতেও। নদীর পাশে ইট খোলার মধ্যে বেড়ে ওঠা। কিছু বোঝবার আগেই মা মারা গেল। সম্ভবত অন্যরকম মৃত্যু ছিল তা। থানা পুলিশের ঝামেলার ভয়ে ইট খোলার মালিক একপ্রকার নামকাওয়াস্তেই আমার দায়িত্ব নিল। বাবা তো আগেই অন্য এক কামিনের সাথে কেটে পড়েছি।’ সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই আবেগ দমন। সব জেনেও মহুলের বুকের ভেতর ব্যাথা করে। তার থেকে সামান্য বড় এই সুপুরুষ ছেলেটির দিকে সে মমতা মাখা চোখে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটার বড় বড় চোখ জুড়ে থাকা কুচকুচে কালো আইবল গুলোতে উনোনের দাউদাউ আগুনের কমলা ছায়া। ‘বুঝতে পারছি!... আচ্ছা নাচ, মানে এই স্পেসটায় এলেন কেমন ভাবে? আপনার সেই বেড়ে ওঠার নদীর ধার, ইটখোলা...তা কোথায় ছিল, জানতে পারলাম না। যদি একটু...’
আচমকা রুঢ় হয়ে ওঠে রোহন । –‘কলাতলি,আমতলি, জামতলি...গঙ্গার পাশে কোন একটা জায়গা; সেটা কি খুব ইম্পরট্যান্ট? নদী, ইটভাঁটা এবং সব জায়গা থেকে লাথি খাওয়া একটা শিশুর জীবন যাপন...সবটাই তো বলা হল। এটাই তো যথেষ্ট স্টোরি!’ -‘আয় আম এক্সট্রিম লি সরি রোহন !’ প্রচণ্ড থতমত খেয়ে যায় মহুল। অকারণেই সে তার লম্বা বিনুনি আঙুলে পেঁচাতে থাকে। রোহন আবার যেন কি বলছে...কিন্তু মহুল
ক্ষণেকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। মনের ভেতর প্রবল ভাবে ঘুরপাক খায়-জামতলি!
-‘আরে আমার তো বাড়ি...’ ব্যাক্তিগত কথা বলার জায়গা নয় সাংবাদিকতা। মহুল থেমে যায়। তাছাড়া রোহণের দু’একটা কথা সে স্কিপ করে গেছে। কী বলছে এখন সে? অহ, ও-ও সরি বলছে!
–‘নেভার মাইন্ড রোহন !’ মহুল গালে টোল ফেলে অপূর্ব একটা হাসি দেয়। রোহন ও লাজুক হাসে। হঠাৎ করে মুড সুইং করার জন্য ছেলেটা সত্যি খুব লজ্জিত হয়েছে। -‘তাহলে সেই থানা থেকে ডক্টর এডওয়ার্ডের এনজিও। ওখান থেকেই আপনার ডান্স স্কুলে আসা? মানুষটি এবং তাঁর এনজিও – দুটোই খুব লিবারাল অ্যান্ড ডিভটেড ছিল বলছেন।’


‘ইয়েস, আবসলিউটলি! উনি আমার কাছে ভগবান! তবে ওনার কাছে যাই আমি এক অ্যাঞ্জেলের হাত ধরে।’ ‘রিয়েলি! সেটা শুনতে পারি কি?’ কথাটা বলেই আড়চোখে একবার মেপে নেয় মহুল। ছেলেটা আবার রেগে যাবে না তো? নাহ;, রোহণের মুখে এক অদ্ভুত শান্ত সম্মোহনের ছায়া। –‘শেষ কীর্তি ছিল চুরি। এভাবেই থানা-পুলিশের মুখোমুখি। তখন পেট-পিঠ লেগে যাওয়া, ঠিকমত খেতে না পাওয়া আট’ন বছরের রোগা টিংটিং ছেলে। এক চোর ডাকাতের দলের খপ্পরে পড়লাম। এ রকমই শীতের শেষ রাত। তারা ঢুকিয়ে দিল সে অঞ্চলের সব চেয়ে রহিস আদমির বাড়ি। এক তলার বাথরুমের জানলা দিয়ে কোনক্রমে শরীরটাকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম। সদর দরজা খুলে দেওয়া অব্দি আমার কাজ ছিল।’
‘তারপর?’ মহুলের চোখ বিস্ফারিত। ‘ধরা পরে গেলাম! আমি এবং আরও তিনজন। লোকজন এসে বিরাট মারধর। ছোট বলে সামান্য রেয়াত করা হয়েছিল আমায়। তবু নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। সম্মিলিত
মারধোর তো! গায়ের জামা ছিঁড়ে ফর্দাফাই। পুলিশ এল। শীতে কুঁকড়ে বসে আছি আমি। ভোর হয়ে গেছে। বাবার স্কুটারে চেপে স্কুল যাচ্ছিল সে। আমার অবস্থা দেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। নিমেষে নিজের স্কুল ইউনিফর্মের সোয়েটার খুলে আমার হাতে দেয়। ঠাণ্ডা হাওয়া এবং কান্নার দমকে ছোট্ট শরীরটা তার থিরথির করে কাঁপছিল। আজ বুঝতে পারি, সমবেত জনগণ এবং পুলিশকে সেদিন ওই বাচ্চা মেয়েটা কতটা অপ্রস্তুত
করেছিল। ছোটদের তো স্ট্যাটাস বোধ থাকেনা। গঙ্গার ধারে আরও কয়েকজন বাচ্চার সঙ্গে আমিও ছিলাম তার খেলার সঙ্গী। ততক্ষণে ব্যাগ থেকে লাল রঙের টিফিন কৌটো বার করে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছে। আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার, শ্রেষ্ঠ আদর!’ নীল কুয়াশার ভেতর দিয়ে আচমকা আগুনের মত উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এক চলমান ছবি! তুমুল ভাবে কেঁপে ওঠে মহুল! তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু একটা শব্দও বার হয় না। অদৃশ্য পর্দায় ভেসে ওঠে শৈশব; ছোট্ট মহুল আর ছেড়া জামা পরে কুঁকড়ে বসে থাকা তার এক
খেলার সঙ্গী। যার নাক দিয়ে তখন বেরিয়ে আসছে সরু রক্তের ধারা!

শুধু তাকে ঘিরেই শুরু হয়ে যাওয়া এক প্রবল ভূমিকম্পের মধ্যে... হাবুডুবু খায় মহুল! অনেক চেষ্টাতেও বাগ না মানা নোনা জলের প্রবাহ... সমস্ত এটিকেট ভাসিয়ে নিয়ে যায়! ঠিক তখনি, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে ছেলেমেয়ে দুটোর পাশে এসে দাঁড়ায় জোগাড়ে ছেলেটা।
-‘স্যার, আপনাদের আর একবার কফি দেব?’
উননের লালচে আগুনের ছায়া কাঁপছে ছেলে-মেয়ে দুটোর ঋজু শরীরে। ওদের শূন্য কাপে, ছেলেটা নিজে থেকেই ধোঁয়া ওঠা গরম কফি ঢেলে দেয়।


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ রিতা মিত্র

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  রিতা মিত্র



ঠিকানা নিশ্চিন্তপুর

সব কিছু পিছনে ফেলে শব চলেছে শ্মশানে
ক্লান্তিহীন চেহারা  নিয়ে শুয়ে আছে চার কাঁধের উপর
'বল হরি বল' এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেচে উঠছে শরীর
গন্তব্য নিশ্চিন্তপুর
পেছনে  রেখে গেছে কালো পিচ রাস্তায় ছড়ানো  খই ,
                                কিছু খুচরো পয়সা আর 
                                কিছু ক্ষুধার্ত পেট। 




২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ মন্দিরা ঘোষ

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  মন্দিরা ঘোষ



আজনবি

 জলরেখা  ভেঙে বেরতে চাই অথচ 
পাখিসমুদ্রে কোনো নীলের আঁচড় নেই
সমস্ত আকাশে মগ্ন অন্ধকার
মেঘের আলফাজে শুধুই নুনের পূর্বরাগ  

ব্যক্তিগত ফুঁড়ে  অভ্যাসের চিল উড়ে যায়
কেবলই সন্ধিবিচ্ছেদ
কেবলই ভুলের অনুপ্রাস

স্পর্শ ফুরিয়ে যাওয়া উল্কিস্মৃতি
গাঢ় উপমা টানে 
তোমার আজনবি মুখোশে


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ অরণ্যা সরকার

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  অরণ্যা সরকার



আবহমান


স্বপ্নের  ছদ্মবেশে কিছু কাতরতা আসে।

বলি প্রেম, বলি বিভা।

উথলে ওঠা গান  ঢেকে দেয়  সমস্ত প্রতীক।

বারবার, বিকল্পের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো অসহ্য মনে হয়।

পরতে পরতে জমানো মৃত্যু মহান করে  ফলক উঠে আসে।

বলি প্রেম, বলি প্রত্নভোর।

তোমার তেষ্টায় থাকি, ভুবনে ভুবন রাখি ভেবে

কি যে রাধিকাপ্রবাহ ! আহা জানলে না

আসলে জানলে সবই, তোমারও তো শ্যামসমুদ্দুর

নুনের সমাচার বয়,  দিনশেষে এগিয়ে আসে সংসারহাত।

অন্ধকার গাইতে গাইতে  যুগল তারের চাঁদ মাখো।  

দৃষ্টির সংগ্রহে কত শুশ্রূষার অভ্যেস আমাদের।

দেখি, আর ভাবি, দেখিনা কিছুই।

মসৃণ ভাবনায় পাখি। পাখি মেধা, পাখি অস্মিতা।

পুরনো প্রেম ঠুকরে খেতে খেতে বলে যায়

এইসবই ঢেউপ্রবণতা…



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ নাসরিন নাজমা চৌধুরী

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   নাসরিন নাজমা চৌধুরী



পরাগপাখি ৪৫

আরও একবার ছুঁয়ে দেবে সেই প্রত্যয়ে শুধু
আগলাই আবছায়া একটু আঁধার,
পুরাতন সব অভিমান।

আরও একবার হাতে হাত হেঁটে যাব চন্দ্রকলায়
মেখে নেব প্রথম কিরণ
শুধু সেই আশ্বাসে চোখ মেলি সূর্য উদয়ে।

জানি অবসান নেই এই বিরহকালের,
জানি আসবে না কোনোদিনই পরাগকিশোর
তথাপি আর সব কাজ ফেলে
অপেক্ষা আয়োজন নিয়ে
চেয়ে থাকি সিংহদুয়ারে।


পরাগপাখি ৪৬

নোনাধরা পাঁজরের ধার ঘেঁষে আজও
হাসনুহানার মিঠে হাওয়া 
পার্থিব সন্ধ্যায় ছুঁয়ে দেয় চাঁদের শরীর,
নিঃসঙ্গ,স্থির অবসর।

বহমান স্রোতে ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতি ভাসে ,
ফিকে হয়ে আসা কিছু ছবি 
বাঙ্ময় কী যন্ত্রনায়!

কিছু ব্যথা নিরাময়হীন, বহুদূরব্যাপী।
উপশম বলে যাকে ভ্রম হয়েছিল,
আলোয় তাকিয়ে দেখি   
অলীক কিশোর আর নেই কোনোখানে।
শুধু তারই অবয়ব ধরে  
আকর্ণ বিদ্রুপে দাঁড়িয়ে রয়েছে অভিশাপ।


পরাগপাখি ৪৭

কত কথা বাকি রয়ে গেল ;
মুখোমুখি ,আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে
নির্জন থইথই ঘাট,
এক আকাশ স্বপ্নকে সাজাবার দিন
বাকি আছে বহুকাল ধরে।

মুখরিত সেই সব দিন ,
কৃষ্ণচূড়ায় রাঙা উজ্জ্বল বসন্তদিন
রূপকথা মনে হয় আজ।

পরাগকিশোর ,সেই যে  
প্ৰথমবারে দিয়েছিলে রক্ত গুলাল
শৈত্যের এতকাল পরে
ধূসর হয়েছে তার রঙ।


পরাগপাখি ৪৮

আজ থেকে বহুবছরের পরে ধরো যদি
দেখা হয় বকুলের পথে
ধবধবে চুল ,কিঞ্চিৎ নুয়ে পড়া তুমি ,
সময়ের ঘষা লেগে ক্ষয়ে যাওয়া আমি
মুখোমুখি আরও একবার ,
সেদিনও কি থেমে যাবে
সময়ের বহমান স্রোত ! সব কোলাহল
বুড়ো ঘড়িটির মত অকারন স্তব্ধ তবে!

পশ্চিমে হেলে পড়া দীর্ঘ ছায়ার পিছে ছুটি,
পল ,অনুপল গুনি আঙুলের কড়ে
কত কত সূর্যোদয়ের পরে ,
আরও কত একলা গোধূলী আলো শেষে
দেখা হবে অলীক প্রেমিক?
সেই দিন সব ব্যথা গান হবে 
পরাগপাখির ডানা ছুঁয়ে,
ক্ষতরক্তের দাগ যত মুছে দেবে অমৃতের ঘ্রাণ।
অপার প্রেমিক ,মনে রেখো সেই দিন 
ধ্বংসস্তুপের বাধা ঠেলে পুনর্জন্ম নেবে 
আমাদের সব অনুরাগ।



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ নিমাই জানা

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  নিমাই জানা



১৩ ডিগ্রির মৃতদেহে সঞ্জীবন চারাগাছ পুঁতেছে ডারউইন

তারপর অপ্রকৃত ভগ্নাংশের ফ্যালোপিয়ানে গজিয়ে ওঠা কিছু স্পাইরাল রঙের স্বমেহন / ক্ষতিগ্রস্ত  নিউক্লিয় জালকের ঠোঁটে এক ডেসিবেল স্পোরিডেক্স রাখলাম

রাতের কম্পাঙ্ক আসলে নিজের কর্নিয়ার ভেতর দ্রিমি দ্রিমি বেজে ওঠে রাবণের সাংখ্য দুন্দুভির মতো
মৈথুন পরবর্তী বীজধান গুলোই অংকুর নিয়ে ফিরে আসে সাদা রঙের লিউকোপ্লাস্টের দিকে , আমি একটি সরাইখানার নিচে বসে কিছু অশোকের ব্রাহ্মলিপি পড়ে ফেলেছি নৈসর্গিক নিরাভরণ চাঁদের সাথে আধশোয়া মৃতদেহের মতো
মৃৎশিল্পীরা নিম্ন স্থিরাঙ্কের চাঁদ ডুবে যাওয়ার পরই আবার জেগে ওঠে মৃতসঞ্জীবনী মতো , আমরা সবাই মায়ের বীজগাণিতিক শ্রাদ্ধের জন্য উৎফুল্ল আনন্দে আমের লালপাতা গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে থাকলাম , কেউ আমাদের গভীর রাতে নাম ধরে ডেকে চলে মৃত্যু সংবাদ শোনার জন্য

প্রথম শ্রেণীর খাদক হয়ে ডারউইনের পিছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে উলঙ্গ জনুক্রম নিয়ে
জীবাশ্ম গুলোই অন্তিম পর্বে ঝুলে থেকে আমাদের অন্তর্বাসহীন স্ক্লেরোসিস দাঁতের মতো , নিজের ভেতরে থাকা পিশাচেরা প্রতিদিন প্রজনন ঘটিয়ে চলে রাতের গভীরতা বাড়লে ,
আমরা কিছু নরম ক্রোমাটিন দানা উড়িয়ে চলি স্বরবর্ণের মতো , ছায়াপথে আমি কিছু পরকীয়ার অনুবীজ রেখে প্রাচীন নিম গাছের ভেতরে থাকা অজস্র অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে টেনে বের করে আনি মাথার পিটুইটারি
একে একে নিজেদের শিফন ভগ্নাংশ সবগুলোকে মেলে দিই নিষিদ্ধ দৈর্ঘ্যের হিমোগ্লোবিন দিয়ে
আমার ব্রাকিয়ালে ১৩ ডিগ্ৰী মৃত্যু চেপে বসে আছে কালো রঙের পোশাক পরে

আজ রৈখিক বন্ধনীর মতো আমার ও আত্মহত্যার একটি উপযুক্ত দিন হতে পারে , কারণ চাঁদ ঠিক ধারালো ব্লেডের মতো চকচক করছে

২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ তুলসীদাস ভট্টাচার্য

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  তুলসীদাস ভট্টাচার্য 




বাঁশি

ঠোঁট মতই পালিশড্ হোক না কেন
সুর কিন্তু আদর বোঝে।

বাঁশির ফুটোয় দম ধরে রাখা
ও দম ছাড়ার রহস্য না জানলে 
যতই ফুঁ দাও , বাঁশি কি আর বাজে! 

বাঁশির প্রতিটি ফুটোয় যে অন্ধকার 
সেখানে ডুব না দিলে 
কানাইয়ের কাছে কি পৌঁছায় 
সমর্পণের আকুতি ! 


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ নীহার রঞ্জন জয়ধর

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  নীহার রঞ্জন জয়ধর



পরিযায়ী             

               

ঘর শুয়ে আছে ঘরে মুখ গুঁজে 

নিজের শ্বাসে বিরক্ত শ্বাসবায়ু 

ঘামের গন্ধে খবর আসেনা -- 

ক্ষুধার্ত অপেক্ষা ফেরেনা জমানো পৌরুষে 

কাঁচাডাল ফলভার সহ  ঈশান কোনায় খোঁজে বৈশাখী


প্রথমত, নাগর-অনুভব ছিল সড়কের  

খালি পা হেঁটে যায় নরনারী দেহে

বাতাস ঘুরে ঘুরে গল্প শুনতে চায় প্রবাসের 

রাত ঘুমোতে পারেনা ছোঁয়া সুখে 

তারাদের কলরব কানে কানে 


মানুষ ফিরছে, প্রবাস ভেঙেছে, প্রাক্তন বাসায়


               

শুধুই স্থানীয় নিম্মচাপ জানে, 

পথের পিঠে ফোস্কা পড়েছে আজ 

দুপুরের চামড়া গলছে যন্ত্রনায় 

ঘরমুখী মড়া কান্নায় বাতাসের কান ব‍্যথা 

দেবতার নাকেও সে অবৈধ-পার্থিব, হানাদার

                   

কিছু কথা চাপা পড়ে প্রকৃতিতে, হয়ত সংস্কারে 

মানুষ বহুবচন হলে নিঃশ্বাসে ঝড় উঠতে পারে




২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ রুমা ঢ্যাং অধিকারী

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  রুমা ঢ্যাং অধিকারী



আকাশের পর্যটনকেন্দ্র

মাঠের দিকে লক্ষ্য ছুঁড়ে চেয়ে থাকা নির্নিমেষ...

রামধনু বিকেল
ফসলের পাশে নষ্ট চাঁদে মীমাংসার লুটোপুটি

x y z...এর বল পেটানোর হাজারো প্রয়াস + পোস্টকার্ড সেঁটে 
উপুড় হওয়া গ্লাশের পতনরোধ = ক্রোনিকালের পোতাশ্রয়ে শুয়ে থাকা ক্ষত

সন্ধে পর্যন্ত চিনিয়ে দেওয়া আধফোটা এক ফুলের শরীরে
জমে এত ধান। ভিড় করে আসে পাখি 
রিপুদোষে সেদিন অচেনা রাতের হায়না

এমন ত্রাসের ছায়ায় বাড়ে কুমির মহাজন
আর প্রাণবায়ু ঠিকানা পায় আকাশের পর্যটনকেন্দ্রে



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ আশুতোষ বিশ্বাস

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  আশুতোষ বিশ্বাস



মাথার খুলি


রাত্রি গভীর হলে বই খুলে পড়তে বসি

বইয়ের পেজমার্ক সরে সরে সবদিনই বুদ্ধু বানায়

মনে করার জোর চেষ্টা করে

পাতা ওলটাতে ওলটাতে পড়া না-পড়ার কম্পিত

সীমানার সন্ধিবিন্দুতে দৃষ্টি গেঁথে দিই

গল্পের নায়ক এখন যেখানে দাঁড়িয়ে তার মিসিং লিঙ্ক

আমার দুর্বল স্মৃতি কোনওভাবেই খুঁজে পায় না।  

টেবিলল্যাম্পের নিমন্ত্রিত আলোর দলা

অক্ষরসমুদ্রে কেঁপে কেঁপে ঢেউ তুলে অবিরল

প্রাচীন পাহাড়ের গা ঘেঁষে

শ্যাওলা-মলিন ইতিহাস-স্থাপত্যের হুলুস্থুলু নিকাশি দরজা দিয়ে

শেষহীন সময়ের দূর নক্ষত্রের দিকে ছুটে যায়

সমুদ্রধৌত চঞ্চলঅক্ষর কংক্রিট প্রস্তরে

অক্কা খেয়ে অদ্ভুত প্রমত্ততায় বীজধান রোপে    

ভাঙা হ্যারিকেন, কেরোসিন ডিবি, মোমবাতি, ল্যাম্পপোস্টের

গরিবি-আলোয় পোশাক ছেড়ে ফের জীর্ণ পোশাক পরে

সহস্র কোটি অক্ষরপোকা মস্তিষ্কের ঘিলু সবটুকু 

খেয়ে সন্তর্পণে তবুও জিইয়ে রাখে মাথার খুলি।



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ সায়ন্তনী নাগ

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  সায়ন্তনী নাগ  || অণুগল্প


বাউণ্ডুলে

ধূসর আকাশে ওরা জড়ো হলো বিষণ্ণ রেখায়। এক ঝাঁক। কতদিন পর! পরিযায়ী ওরা। লক্ষ মাইল পথ পেরিয়ে ফিরে আসে মাঝেমাঝে। বোবা গাছটি আকুল হাত বাড়িয়ে ডা্কে,‘এসো! দেখো কত দীর্ঘ কালবৈশাখী আমি আগলে রেখেছি তোমার সংসার। কত ভালোবেসে লালন করেছি অন্ধ শাবক। সঞ্চয়ের খুদকুঁড়ো। ’পাখি আসে না। পালকে তার সংসার ভাঙার স্পন্দন। ডানায় আলো। ঠোঁটে অন্ধকার, আবহমানের। পুরনো বাসাটিকে চিনতেই পারে না বাউণ্ডুলে। অবলীলায় খুঁজে নেয় নতুন গাছ। শুধু তার পরিত্যক্ত সাদা পুরীষে আপাদমস্তক ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকে স্থবির বট।


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ অজন্তা রায় আচার্য

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  অজন্তা রায় আচার্য 



লালন পালন


আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ধানকাণ্ডের সমগ্র

তাকিয়ে আছে ধ্বজাপত্র

কার্তিকের সোনা রোদে গা ধুয়ে সোনালী মসলিন পরনে

তার আটমাসের লালিমা- স্বাদ ভক্ষণ করেছে দিন হলো

গর্ভভারে মাটির কাছে বিনতা ধানছড়া মেয়ে

উৎফুল্ল হয়ে শোনাচ্ছে তার ভ্রূণের নড়াচড়ার গল্প  

এর চেয়ে বিশুদ্ধ,এর চেয়ে আদিম দৃশ্য আর কিছু নয়

 মাটির মমতা শীকরসুধা সেচন করে   

মায়ের দেহখণ্ড জুড়ে লালনের স্তব

পালনের সুর গাইছে পিতাপ্রতিটি আকাশ একক 



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ নবনীতা সরকার

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   নবনীতা সরকার



জন্ম বিষয়ক
 
এখন তো মার্চ,
মার চোখে দেখছি দিনে দিনে কেমন
'চ' হয়ে যাচ্ছে ত্বক।রোদ্দুরের বয়স বাড়ছে ।

যে বয়সে আমি আলোর পাশাপাশি হেঁটে গেছি
সে বয়সে এত বৃদ্ধ ছিলনা রূহ্
এখন সূর্য কেমন কুঁচকে যাচ্ছে, বিকালের আগেই
ভেঙে যাচ্ছে 'খ'এর সর্বনাম -
সিগারেট পুড়ে
ক্ষয়জাত সংসার।

চৈত্রের রঙে আমের মুকুল হলুদ... 
জন্মে বিষ্ফোঁট নিমফল ।

এখন তো মার্চ,
আমি এক নামবাচক সন্তান,সন্তানবাচক
নাম -চৈত্রের ঝরে পড়ার শব্দ পেলেই মনে মনে ভাবছি
এমন মৃত্যুদিনেও, 
জন্মদিন আসে বুঝি? 


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ তপন মন্ডল অলফণি

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   তপন মন্ডল অলফণি



আলো

শয়তানগুলোর মাথা দেখি না আজকাল
যেটুকু দেখি হাত-পা আর একরাশ বারুদ 
মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটা পাগলপারা 
এইসব অগ্রন্থিত ভাবনার জালে বাঁধাপরা মানুষগুলোকে 
একটু আলো দেবার মতো কোন মাথা নেই 
শুধু আছে একরাশ স্বপ্নদোষ মুদ্রাদোষ


এইসব রক্তক্ষরণের চেয়ে ওদের একটা ক্লান্ত রাত্রি 
                          উপহার দিক কেউ
পরেরদিন প্রথম সূর্যের আলোর মতো
কেউ মাথায় হাত রেখে বলুক
এদিকে আলো আছে আলো 
যেভাবে বাঁধ ভাঙে জল


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ সোমো ঘোষ

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  সোমো ঘোষ



সংবাদ শিরোনামে...

দরজা খোলার আগে পর্যন্ত ভাবছিলাম তুমি।
জানো... ওই পিঁপড়ে আর দানা চিনির গল্পটা আজ আবার দেখলাম।
ছোট পিঁপড়েটা মন্তাজ ভেঙে ভেঙে চিনির দানা টা নিয়ে ছুটছে ছুটছে....
ছুটছে...
               সে যাই হোক , শহরে আর এতটুকু কীটনাশক অবশিষ্ট নেই - এইমাত্র এলো সংবাদ শিরোনামে।



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ তুলি রায়

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   তুলি রায়



সূত্র

গনগনে দুপুরে পাতারা ঢলে পড়লে জল দিও না। বরং তারও বেশ খানিকটা আগে দিও। জানি এসময়টা ওরা রান্না করে। ঘরে থাকা মানুষেরা ঘুমায় যদিও। কেউ কেউ জেগেও থাকে, কেউ আজন্ম ঘুমে। কাজের সাথে ঘুমের একটা সুক্ষ্ম যোগসূত্র আছে।  সেই সুত্র ধরে সিঁড়িতে আলোরা আসা-যাওয়া করে। ভাঙাচোরাওয়ালা হেঁকে যায়, ক্ষণিক থেমে  ক্লান্তি কাটাতে চাপকল থেকে কিছুটা জল খায় তারপর মলিন গামছাটা দিয়ে ওর উপার্জনের ঘাম মোছে। অভুক্ত পেটের  ব্যাকরণ আজ অবধি লিখিত হয়নি। সাজানো শব্দ, শাদা পাতা  নির্ভুল কাটাকুটি খেলে যায়।  বেলা বয়ে আসে। মাসিক জটলায় তখন শেষ বসন্তের কোকিল।  বুঝতে পারি পাখিরা ফুরিয়ে আসছে।