Monday, 9 May 2022

২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ সম্পাদকীয় নয় কিন্তু

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   মন্দিরা  ঘোষ



সম্পাদকীয় নয় কিন্তু

ছোট মুখে বড় কথা হয়তবা, হয়ত নয়! মানুষে  মানুষে ভাবনার বৈপরীত্যে স্বতন্ত্রতার জন্ম হয়।ভিন্ন স্বরের মাত্রা মেপে নেয় নির্ণায়কসভা।  ’আমি’ আর ’আমিত্বের’ সীমানায় স্বৈরিতাকে মেনেই সবক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার  ধারা চলতে থাকে। বাধ্যতা থাকে না সেই নির্দিষ্ট  মতকে মেনে নেওয়া বা বাতিল করার।
 প্রসঙ্গটি ওয়েব পত্রিকার বহমানতা ও তার ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে আমার কিছু কথা।

       সময়ের সঙ্গে চলতে চলতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে  যন্ত্রমুখী হয়ে পড়েছে আমাদের জীবন।।প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংযোগ বা যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে আন্তর্জাল।স্কুল কর্মক্ষেত্র দৈনিক যাপনে কেউ-ই এড়াতে পারি না এর সুফল। সাহিত্যসভা পত্র পত্রিকাও  পিছিয়ে নেই। ই বুক বা ওয়েব পত্রিকার মাধ্যমে অজস্র  লেখা, অজানা তথ্য এত সহজে হাতের মুঠোয় পাওয়া যা কল্পনাতীত ছিল।
অনেকে বলবেন ওয়েব পত্রিকার এই বাড়বাড়ন্তে হারিয়ে যাচ্ছে লেখার মান।যে কেউ সম্পাদক হয়ে ওঠার অদম্য ইচ্ছেই যে কোনো লেখাকেই কবিতা বলে দেগে দেওয়ার প্রবণতা মাথা চাড়া দিচ্ছে।
কথাটা অস্বীকারের উপায় নেই।এক্ষেত্রে  একজন  সম্পাদক তার দায়িত্ব  এড়াতে পারে না।ওয়েব ম্যাগাজিন যে কোনো মুদ্রিত পত্রিকার চেয়েও  গুণে মানে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার দাবি রাখে আর পুরোপুরি সে দায় সম্পাদকের ওপরেই বর্তায়।নতুন মুখ,নতুন কন্টেন্ট,প্রত্যন্ত থেকে খুঁজে আনা মণিমাণিক্য.... সমস্তটাই হতে পারে একজন দক্ষ, নিরপেক্ষ, সহানুভূতিশীল, সাহিত্যমনস্ক সম্পাদকের বিবেচনায়। একটি কবিতা পত্রিকার উদ্দেশ্য তো কেবল কবিতা  বা গল্প/প্রবন্ধ প্রকাশ নয়!

        নতুন আর পুরনোর মেলবন্ধনে সুচিন্তিত নির্বাচনে আগামীকে উৎসাহিত করার উপাদানে সহিষ্ণুতা দেখানো দরকার।
সব সম্পাদকের বানানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।আমার তো মনেহয় ওয়েব পত্রিকা আরও বেশি করে এব্যাপারে সচেতনতার দাবি রাখে।পত্রিকা ত্রৈমাসিক হোক,অনিয়মিত  হোক কিন্তু নির্ভুল আর স্বচ্ছ হোক।
কোনো নতুন কলমে আগামীর আলোকিত ভ্রূণ  লুকিয়ে আছে কী সে দায়িত্ব ও কিন্তু একজন নিবিষ্ট সম্পাদক এড়িয়ে  যেতে পারেন না।
অন্য অনেক পত্রিকার ভিড়ে মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা, সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন নতুন কিছু করে দেখানোর স্পর্ধায় কলার তোলার অধিকার দিয়েছে অনুজদের , সঙ্গে  অগ্রজদের হাতে পথ দেখানোর আলোকবর্তিকা। 

        আমার মনে হয় সম্পাদকের আরও দক্ষ, আরও সুচিন্তিত নির্বাচন, সেই পত্রিকাটি আন্তর্জাল বা মুদ্রিত যে মাধ্যমেই হোক, পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে পাঠকের মনে তার নিজস্ব ছাপ রেখে বহমান হবে  বলেই আমার  বিশ্বাস।

বাকিটা....পাঠকের হাতে ছেড়ে রাখলাম।



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ পিনাকী রঞ্জন সামন্ত

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  পিনাকী রঞ্জন সামন্ত



একটি হারমনিক কবিতা

কতো মানুষের আসা যাওয়া দেখি
কতো গাড়ির আসা যাওয়া
পাখিরা নিত্যদিন আসে আর যায়
দ্রব্যমূল্য শুধুই বাড়ে আর বাড়ে
মানুষের উপার্জন নেমে আসে নীচে
কতো কবির কতো কবিতা দিনরাত পড়ি
কতো কতো আলোর ভিতরে
আমি এক একা অন্ধকার.....কালো

জেগে থাকি
জেগে থাকি
জেগে থাকতেই হয়....
তবু
একটা প্যারামিটার অফ প্যারাডাইস
একটা ওয়েভ অফ হারকিউলিস
আর একটি উদভ্রান্ত tripical mathematics
আমাকে ভর করে, আমাকে ভাবায়
আর ভাবতে ভাবতে ক্রমে ক্রমে
আমি নিজেই
কেমন যেন একটি বৃত্তাকার হারমনিক, 
হারকিউলিস 
কবিতা হয়ে যাই ।


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ নীলিমা সাহা

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  নীলিমা সাহা



ক্যামেরা চলছে

নিজের কাছেই ফিরে আসি
বদলে ফেলি ভ্রমণ

খোলা জানালা,সামনে বহতা নদী , দেয়ালঘড়ি ছুটছে
ট্রেনের গতিতে
বিছানায় সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জল আর মাটির গোপন খবব্রে
যুদ্ধধ্বস্ত সেই নাবালিকার না-বলা কথা

ভূমিকা নেই,উপসংহার নেই ঝিঁ ঝিঁ ডাকের অন্ধরাত..ইঁদুরেরা
খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে চৈত্রকবিতা

এদিকে ঝকঝকে টেবিলে অপেক্ষা করছে জরুরী বৈঠক

হায় সম্মিলিতক্ষমতাসংস্থা,বারেবার ভোট দিই
যন্ত্রণার পিঠে

চশমায় আবছা আকাশ,সমতটে মেঘরোদকালোজিভের দৌড়াদৌড়ি

নিজের ভিতর নিজেই অপেক্ষায় থাকি



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ আলোক মণ্ডল

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  আলোক মণ্ডল




দহন

পরমাত্মিক ভোজের পর এসো ব্যভিচারী হাওয়া
শিশ্ন চূড়াতে কালজয়ী ঘাম এসো কোকিল বাসনা এক ডুব আচমন
দেহ গন্থিতে রাখা শিলীভূত বরফ জাগো
তমসা মুহূর্ত গুলো জ্বলে উঠুক
প্রচন্ড তাপে ছারখার হোক শিথিল নৈঋতমণি
আহ! শব্দ উচ্চারণ তরঙ্গে ভাসুক আজ প্রতি পল অনুপল ভাঙুক কামার্ত মাটির তৃষা
ছায়াযুক্ত কায়াবোধ এসো  শতাব্দী প্রাচীন এই দহন ক্রিয়ায়।
ওপাড়ার আহামরি উশৃংখলা দু'দণ্ড দাঁড়িয়ে
দ্যাখ,  
ঈর্ষা বানানে বুলাবে আঙুল চকখড়ি কত কত বার!


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ ব্রতী মুখোপাধ্যায়

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  ব্রতী মুখোপাধ্যায় || অণুগল্প



আদর্শ, আদর, আদম  

 

তুলি নামিয়ে রেখে আদর্শ ইজেলের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে। নীলের ছায়া, ভারী নীল। লালের ছায়া, ভারী লাল। যা   আনতে চাইছে আসছে না।

 

পশ্চিমের জানলার কাছে এবার সে। সিমেন্ট মিলের ছাই বুকে ভরে আকাশটি এইসময় বড়ো বেশি ঘোলাটে। আদর্শ জানে অল্পসময় চেয়ে থাকলেই মাইগ্রেন। আসিলা কপালে হাত বুলিয়ে দিত।    

 

প্রফেসর দত্তগুপ্ত খুন হয়েছিলেন। মাসছয়েকের মধ্যে স্ত্রীও মারা যান। স্ত্রী অবশ্য খুন হননি, হার্টে ব্লকেজ ছিল।        

 

প্রফেসর মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতেন। বলতেন দুনিয়ায় শান্তির ধর্ম ইসলাম। এই নিয়ে নানাজনের সঙ্গে তর্কবিতর্ক হত। তবে আদর্শ যেদিন আসিলাকে ঘরে নিয়ে এল, প্রফেসররা মেনে নেননি। বললেন, সিয়া হলেও ভেবে দেখা যেত। এ যে সুন্নী।  

 

আসিলাও আদর্শকে ছেড়ে চলে গেল। আদর্শকে তার আর ভাল্লাগছিল না। আদর্শর কিছুই তার ভাল্লাগছিল না   এইরকম বলে চলে গেছে সে।

 

আদর্শ শুধু বলেছিল, তোমরা বড়ো রিজিড।

আদর্শ তোমরা বলেছিল।

 

আদর্শকে আসিলা আদম বলে ডাকত, শাশুড়ির মতো কখনও আদর বলেনি।      

 

তোমার বাবা খুন হয়েছেন, তুমি বলেছ আমার জন্যেই।

আমি এমন বলিনি। ভাবতেও পারি না।

তাহলে কেন অজানা কেউ প্রফেসরকে ঘরের সামনে গুলি করে যাবে?

তোমার জন্যে নিশ্চয় না।

তুমি বলেছ আমার জন্যেই।

আমি এমন বলিনি।  

বলেছ।

বলিনি।

বলেছ।

 

কদিন পরে আসিলার মা একবার কল করেছিল। আদর্শ ডিক্লাইন করে দিয়েছে।

 

বিকেলান্তের কমলা ইজেলের ওপর এইসময়। আদর্শ দেখল ছবিটি কাঁপছে। খুব জোরে কাঁপছে। আদর্শর বাবা আর মা ছবি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।  

 

অবিশ্বাস্য। অসম্ভব। ভাবতে ভাবতেই প্রফেসরের ঠোঁট নড়ল, কি এচিভ করলে এই জীবনে?

আমি কিছুই এচিভ করতে চাইনি।

তাহলে কি চেয়েছিলে?

ছবি আঁকব, তুমি জানতে, তোমরা জানতে।

দেখো, আমরা আসতাম না, আসিলা তোমাকে ছেড়ে চলে যাবার পর তুলি হাতে নিলেই তুমি মনে মনে আমাদের ডাকছ।  

জানি না।

আসিলা এখন কোথায়?

জানি না।

 

পেলেটে নীল রং ছিল, গাঢ় নীল ছিল, কমলা, পিংক, গাঢ় সবুজ ছিল। আদর্শ পেলেট হাতে নিয়ে সব রং ইজেলে    ছুঁড়ে দিয়ে হাতের তালুতে মুখ ঢেকে কাঁদছে।

 

এইসময় ইজেলের ওপর চাঁপা রোদের আদর। জানলায় আসিলা কপালে আছড়ে পড়া চুলের কুচি ডান দিকের কানের পাশে সরিয়ে দিচ্ছে, মিনেকরা ঝুমকো দুলে উঠেছে। কোনটি সত্যি কোনটি বিভ্রম আদর্শ ধরতে পারছে না। 




২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ রথীন বন্দ্যোপাধ্যায়

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   রথীন বন্দ্যোপাধ্যায়



এই পৃথিবীর সমস্ত ঘর      

যেন চার দেয়ালেও ঘর নয় তেপান্তর
সিলিং মানে গ্রীষ্ম আকাশ হাজারখানেক অসহ্য
রঙমশাল
যুগলবন্দী চৌরাশিয়া এবং বব ডিলান
পুঁজি এবং সাম্যবাদ একই পাত্রে খাচ্ছে ঘি
এসব ততক্ষণই, মধুর সাথে মৌমাছি....

অঙ্কগুলো না মিলতেও পারে
হঠাৎ কোনও যুদ্ধ হল শুরু
কার নিঃশ্বাস পড়ল কার ঘাড়ে
কিংবা তুমিই রাজাধিরাজ গুরু

সমস্ত ভুল ভাঙলে পৃথিবীর
সব নদীর......

চার দেয়ালের ঘরগুলো হোক নীড়, মন্দির 

২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  দেবাশিস মুখোপাধ্যায়



ক্ষয় লিপি ৮

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় হাওয়াসুন্দরী। রীল খুলছে
কাগজ পূর্ব প্রেমের । রক্তক্ষরণ চলমান

মানতেই হবে বলছি না। নাগরদোলায় হাতে
হাত জোছনা মাখছে । ছেড়ে না যাবার শপথ

পথের মাধবীলতা । তার গতি স্থির কিন্তু আলোকিত। তমার বিপরীতে এক সম্মোহন

মোহন সিং খাঙ্গুরার রবিগান । নম্র করছে উগ্রতা ।‌ তালা খুলে উড়িয়ে দিচ্ছি অহংকার

কারা আবৃত্তি করছে ছোট ছোট তারার ছন্দ
আর ব্যালকনি চশমা খুলেই তুলছে স্বর্গ 



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



সবুজের উঠোনে 

আলমারিতে বইয়ের পাতার সমুদ্রে এখনও 
দু'চারটে নাম নাক তুলে আলো হাওয়ায় জায়গা নেয়
হারিয়ে যাওয়া কিছু দোফসলি গ্রামের উদ্ধারের খবর
দশ পাতার চতুর্থ কলমে পঞ্চাশ শব্দে প্রকাশ পায়

তবুও কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না 
ছবিঘরের ইজেলে টাঙানো মৃত মানুষের ক্যানভাস
মেঘলা আকাশের মতো ধূসর রঙে ডুবে আছে 
অগণন মাটি মানুষের হাতের তালু 

নদীর ওপার থেকে মাইকের গান ভেসে আসার মতো 
মাঝে মাঝেই একটা ভেজা হাওয়া 
বুকের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে বাঁচার ফুঁ 

সবুজের উঠোনে 
স্পষ্ট হিজিবিজি সমীকরণের দাগ দেখে 
মেঘ ফাটিয়ে রোদের মাদুরে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকাচ্ছে
এক কিশোর । 


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ সম্পাদক হওয়ার অভিজ্ঞতা

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   রিতা মিত্র
                                         


সম্পাদক হওয়ার অভিজ্ঞতা

আমরা যারা কলমের কারিগর মানে ফুলটাইম বা পার্টটাইম লেখালেখি করি  তাদের একটি স্বতন্ত্র ইচ্ছে ডানা থাকে। কবিতা, গল্প , প্রবন্ধ সে যাই লিখি না কেন, সেখানে আমাদের কলম কোনো সীমানা মানে না কিন্তু যখন সম্পাদক, সম্পাদনা , সম্পাদকীয় নামের দায়িত্ব ঘাড়ে বর্তায় তখন ব্যপারটা ঠিক ৩৬০° ঘুরে যায়। তখন প্রতিটি পদে দায়িত্ব নামক পাথর কলমের পথ অবরোধ করে এবং সেটাকে যে ঠিকঠাক ম্যানেজ করে উঠতে পারেন তার নাম সম্পাদক। 

     এ যাবৎ প্রায় তিনটি পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য পদে রয়েছি। আমার মতে প্রতিটি পত্রিকার নিজস্ব চরিত্র থাকে এবং সে সেই ভাবেই পত্রিকা সাজিয়ে তোলে। 
কিছু পত্রিকার মুলমন্ত্র হল আপডেটেড কবিতা নিয়ে পথ চলা ও প্রশ্রয় দেওয়া। 
কিছু পত্রিকার চরিত্র নিজের শেকড় কে আগলে রাখা এবং তারই চারপাশে পরিক্রমা করে লেখা নির্বাচন করা। আর কিছু পত্রিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। যেমন পাহাড় ভেঙে নতুন পথের দিশারী হয়ে ওঠা। অভিজিৎ দাস কর্মকার  সম্পাদিত মল্ল্য সাহিত্য ই-পত্রিকা সহ-সম্পাদক মন্দিরা ঘোষ এবং আমি( রিতা মিত্র) সেই পথের পথিক এবং এই মহান ব্রতের ব্রতী হতে পেরে আমরা খুশি । 

   একটা পত্রিকা সম্পাদনার পেছনে বহু পরিশ্রম থাকে। প্রথমতঃ লেখা নির্বাচন। লেখা নির্ভূল  হওয়া আবশ্যক। যে কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার নেপথ্যে অনেক  দৌড় ঝাঁপ থাকে। নির্বাচিত লেখা প্রেসে নিয়ে যাওয়া , ফার্স্ট প্রুফ, সেকেন্ড প্রুফ দেখা, পেজ সেটিং করা ইত্যাদি । পত্রিকার জন্য প্রচ্ছদ নির্বাচন করা এই সব কাজের কিছুটা অভিজ্ঞতা রয়েছে। যদিও এই সব কাজ ছাপা পত্রিকার ক্ষেত্রে  করতে হয়। এখন অন লাইন পত্রিকার যুগ এই দৌড়াদৌড়ির কাজ কমে গেছে তবুও মস্তিষ্কের কাজ যথারীতি করতেই হয়। দ্বিতীয়ত পাঠকের আকর্ষণ বজায় থাকে সে ব্যপারে খেয়াল রাখা। নতুন বিষয় নিয়ে গবেষণা ধর্মি লেখা আহ্বান করা। কবিতার বিভিন্ন ধরণ কে ভিত্তি করে লেখাকে প্রশ্রয় দেওয়া। নতুন পুরোনো সকল দশকের লেখকের লেখা নেওয়া। যাতে সকল রকম পাঠকের মন ছোঁয়া যায় তাদের হৃদয়ে  পাকাপাকি পত্রিকা  স্থান করে নিতে পারে। যেন পাঠকের মন ব্যাকুল হয় পত্রিকাটি পড়ার জন্য। যেমন প্রেমিক প্রেমিকা অধীর অপেক্ষা করে একে অপরের জন্য। ঠিক সেই উচ্চতায় পত্রিকাকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব সম্পাদকের। ঠিক তেমনি দায়িত্ব লেখকের উপরেও বর্তায় পত্রিকার মান বজায় রাখার জন্য নিজেকে ক্রমশ আপডেট ও আপগ্রেড করার।



২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ অমিত সরকার

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  অমিত সরকার  || গল্প



মেয়েটা ও ইউনিকর্ণের অন্ধকার

‘মেয়েটার চোখ ফেটে বরফ ঝরছে এখন, রুপোলী সাদা বরফের ফুলেরা উড়ে যাচ্ছে দুপাশ দিয়ে। তার মধ্যে তীব্র উড়ে চলেছে তার ইউনিকর্ণ। ইউনিকর্ণের পিঠে কাত হয়ে লেপটে আছে ওর সোনালি ঝাঁকড়া মাথা ভর্তি চুল। দুহাতে শক্ত করে ধরা তার গলার কেশর। এতো জোরে চেপে ধরা যে ওর লম্বা লম্বা নখগুলো বিঁধে যাচ্ছে নিজেরই হাতের তালুতে। ফুটে উঠছে বিন্দু বিন্দু রক্ত, যেভাবে ঘাম ফুটে ওঠে তীব্র শীৎকারের পর। বুক ছুঁয়ে ফিরে যাওয়া তরোয়াল থেকে ফুটে থাকে রক্তদাগ। নীচে সমুদ্র হাত বাড়িয়ে ওকে ছুঁতে চাইছে বারবার। কিন্তু পারছে না। মেয়েটার কোন পূর্বজন্ম নেই, পরজন্মও নেই। ধূসর আকাশে শুধু একটা ফেলে যাওয়া জেটপ্লেনের স্মৃতিদাগ যেন...’ এই অবধি পড়ে থামল সে। ভদকায় একটা চুমুক দিলো, একটা সিগারেট ধরালো। তারপর জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলো। বাইরে শব্দহীন আলো, ক্ষীণ আওয়াজ কখনো কখনো। পাখিদের, পাতাদের, হাওয়াদের, নৈঃশব্দেরও খানিকটা যেন। সে তখন শুনতে শুনতে উৎসুক অপেক্ষায়, কারণ আমরা তো যে কোন কিছুর মধ্যে আসলে একটা ফিরে আসা নিজস্ব অভিজ্ঞতাকেই খুঁজি। যখন মিলে যায়, তখন বলি খুব ভালো। আর না মিললে ? সে ভাবলো, তাহলে কি ব্যক্তিঅভিজ্ঞতার বাইরে মানুষ কিছুই বানাতে পারে না। তারপর নিজেই হেসে ফেললো কথাটা ভেবে। কেকুলে যখন স্বপ্ন দেখেছিল দুটো সাপ পরস্পরকে ল্যাজের দিক থেকে গিলে খাচ্ছে, কোন ব্যক্তি অভিজ্ঞতাটা তার ছিল ?  বেঞ্জিন রিং তো তারপরই। কেকুলেই এটা লিখে গেছে। সে আকাশে তাকিয়ে একবার উড়ে যাওয়া দ্রুতগামী ইউনিকর্নটাকে দেখতে চাইলো। একবার দেখতে পেল হয়তো, কিন্তু আকাশে এতো মেঘ, তারা তাকে বারবার ঢেকে ফেলছে।
‘কি হলো, পড়ো ?’ সে প্রশ্ন করে।
‘কিছু কি হবার কথা ছিল ?’ অনেকটা থেমে সে উত্তর দেয়। ভদকার গ্লাসটা শেষ হয়ে আসছে। মোবাইলের স্ক্রিন তাকিয়ে আছে তার দিকে, সেও অপেক্ষায়। আরে, অপেক্ষাতেই তো।
‘শুরু হলে একটা শেষ তো চাই। একটা শেষের বাহানা অন্তত।’
‘যে কোন শেষের কি একটা বাহানা প্রয়োজন ? এই যে ইউ-এস-বাংলার প্লেনটা কাঠমুন্ডু এয়ারপোর্টে পৌঁছে চাকা স্লিপ করে পঞ্চাশ জন যাত্রীকে নিয়ে...। কি বাহানা ছিল তার ? অথবা ধরো, সিক্সথ আগস্ট ১৯৪৫, সকাল আটটা ষোল। পল টিবেটস এনোলা গে প্লেনটা নিয়ে হিরোশিমার ওপরে সঙ্গে ‘লিটল বয়’। তুমি জানো পলের মায়ের নাম ছিল ‘এনোলা’। তখন নিশ্চয় ওখানে বাচ্চাগুলো স্কুল যাচ্ছে। অনেকে ব্রেকফাস্টের টেবিলে মুখে তুলছে সুদৃশ্য চায়ের কাপ। বউ, প্রেমিকা বা কোন বেশ্যাকেও নিশ্চয় আদর করছে কেউ কেউ। কেউ কেউ হিসেব করছে আর কত ইয়েন হলে এ মাসটা ঠিকঠাক চলবে। ঠিক পরের মুহূর্তে নব্বইহাজার থেকে একলাখ তিরিশ হাজার লোক স্রেফ নেই হয়ে গেল। কি বাহানা আছে তার ? চাইলে আরও অসংখ্য উদাহরণ আমি...। সিরিয়ায়, নাইজেরিয়ায়। সে দেখল সে উত্তেজিত হয়ে উঠছে। সে আস্তে করে তার আঙুলগুলো স্পর্শ করলো। নিকোটিনের হালকা দাগ, সরু, একটা আংটির পুরনো দাগ, তারই উপহার দেওয়া। হারিয়ে যাওয়া আংটিটার মতো সে ক্রমশ শান্ত হয়ে এলো। সে ভাবলো, ‘ওর মন সব কিছুর পেছনে একটা যুক্তি খোঁজে। অথচ নিজে...’ হেসে ফেললো আলতো করে। সে আবার পড়তে শুরু করলো, ‘মেয়েটার কোন বাহানা ছিল না। ছোট্ট মুঠোয় সে শুধু একটু সময় লুকিয়ে রেখেছিল। যে রকম আমরা সবাই রাখি। শক্ত পেরেকের মত কঠিন সময়, গেঁথে ছিল হাড়ের গভীরে। তাই সে হেঁটে গেলে সময় বেজে উঠত র‍্যাটেল স্নেকের মত, স্যাক্সোফোনের মত, তারাদের টুকরোরা যেমন কখনো কখনো বেজে ওঠে অন্ধকারের গভীরে। কালীপূজোর রাত্রি উজ্জ্বল করে আকাশে ছড়িয়ে পড়া তারাবাজি হয়ে সে কি সেইমুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে চাইছিল খুব ? কি জানি। তবে হাওয়া থামতে চাইছিল না। সমুদ্রঢেউ গিলতে চাইছিল, ইউনিকর্ন চাইছিল, কি চাইছিল ? ... না, এটা আমি সঠিক জানি না।’
‘আসলে ইউনিকর্নেরা কি কখনো কিছু চায় ? পবিত্রতা কখনো কিছু চেয়েছে মেয়েটার কাছে ? ইউনিকর্নের রক্ত তোমার গায়ে লাগলে তোমার কি হবে তুমি জানো ?’
‘কি করে জানবো ? পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই তো হ্যারি পটার পড়েছ ?’
‘ওই দেখ। তুমি আবার আহত হচ্ছ। তুমি হারকিউলিসের মিথের রেফারেন্সও দিতে পারতে ?’
‘পৃথিবীর সমস্ত লেখাই আসলে কোন না কোন মিথের একটা ইন্টারপ্রিটেশন। এইটা তো তুমিও জানো তাই না।’
সে একটু আহত হল। ও কি মিথের বলল, না মিথ্যের বলল। সে ভাবলো, ও তো নিজেও লেখে, এটা তো ওর জানা উচিত। সে হয়তো বিশ্বাস করে বানিয়ে খুব কিছু লেখা যায় না। একটা সত্যির নিউক্লিয়াস লাগে। একদা সন্দীপন এমত কহিয়া ছিল। কিন্তু ওর মেয়েটা তো একটা বানানো যাপনের ঘোরেই সারাটা জীবন। ও আবার আকাশে তাকিয়ে ভদকার গ্লাসে দীর্ঘ চুমুক দিল। মেঘের গায়ে ওই কালো বিন্দুটা হয়তো সেই ইউনিকর্নটা। মেয়েটাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

2

‘তুমি কি জানো, থ্রেস্টাল বলে একধরনের ইউনিকর্ন আছে, যাদের এমনিতে দেখা যায় না। যে বা যারা কখনোমৃত্যুকে স্পর্শ করেছে, একমাত্র তারাই দেখতে পায় তাদের ।’ সে আবার শুরু করলো ।
‘কে মৃত্যুকে স্পর্শ করে নি বলো তো ? যে মুহূর্তে মারের কন্যারা গৌতমের জন্য বিছিয়ে দিল নিজস্ব যোনি, এবংসেই মুহূর্ত থেকে কি তারা নিজেরা মৃত্যুকে স্পর্শ করলো না ? সেই মুহূর্ত থেকেই কি তাদেরও অর্হৎ জন্মের শুরু নয়। অযৌন মৃত্যু থেকে শুরু করে যৌন জন্মের দিকে হেঁটে যাওয়ার উল্টোরথও কি সমান সত্যি নয় ? যে মুহূর্তে বাইপাসের ধারে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা আমাদের মেয়েটার দিকে চোখ টানটান করে তাকালো রাত দশটার অটোচালক, বাইক নিয়ে দ্রুত পেরিয়ে যেতে যেতে থেমে যাওয়া হেলমেট, আস্তে করে পাশে থেমে যাওয়া লম্বা সেডান। এমনকি রাস্তার পাশে গলাগলি পুলিশ ও মাতাল। সেইসব প্রতিটা মুহূর্তেই কি ঠাণ্ডা মৃত্যু একবার করে আঙুল ছোঁয়াল না আমাদের মেয়েটার মেরুদাঁড়ায়। সেই মুহূর্তেই কি ও ভাবছিল না সেই সাদা ইউনিকর্ণটার কথা ?’ কল সেন্টারের মনিটর এখন মেয়েটার সামনে শুধুই বিপ বিপ বিপ, কাচের জানলা দিয়ে প্যারাগ্লাইডিং করে ঘরে ঢুকে পড়ছে চাঁদ, মেয়েটার মনে পড়ছে লেডিস হোস্টেলের চিলেকোঠার ঘরে তার একচিলতে বিছানায় এখন ভেসে আসছে কামিনীফুলের রঙচটা গন্ধ। মেয়েটা ভাবলো এরা ভীষণ খাটায়। অথচ সেরকম স্যালারি দেয় না। সে নোকরি বা মনস্টার ডট কমে আবার একবার সিভিটা আপলোড করে দেখবে। সে ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বার করতে গিয়ে একটা পেন ড্রাইভ তার হাতে ঠেকল। একটা সবুজ সাপ সঙ্গে সঙ্গে নেমে গেল তার শিরঁদাড়া বেয়ে। এই অফিসেপেন ড্রাইভ আনা স্ট্রিক্টলি বারণ। ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চাকরি চলে যাবে। সে এসব জানে, প্রথম দিনথেকেই। তবু কীভাবে যেন ব্যাগের ফাঁকে ফোকরে আজ রয়ে গেছে এই স্যানডিস্কের ষোল জিবি টুকরো। সে একটু
ঘেমে উঠলো। তার মনে হচ্ছে আজ পিরিয়ডস শুরু হবে। এমনিতে অসুবিধা নেই। সেক্টর ফাইভের এই অফিসে প্রতি তলায় ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন আছে। তবু সে ইউনিকর্নের কাছে প্রার্থনা করলো, যেন তার পিরিয়ডটা আজ না শুরু হয়। মুখে ঘাড়ে একটু জল দিয়ে আসার জন্যে সে সিস্টেম থেকে লগ আউট করে গেল। সে তো জানে তাদের অ্যামস্টার্ডামের বাগানে এখন প্রচুর রঙিন টিঊলিপ ফুটেছে। সবুজ পাতাদের ধুয়ে
দিয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডা সামুদ্রিক হাওয়া। তাদের ছোট্ট ইয়টটায় তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সাদা পোশাকের
ক্যাপ্টেন তাঁর সোনালী স্ট্রাইপে অধৈর্য হাত বোলাচ্ছেন বারবার। বাতাসে ভাসছে কড়া অ্যামফোরা তামাকের
গন্ধ। তার বাপীর ওভারকোটের কলারে গুঁড়ো গুঁড়ো তুষার লেগে। তাদের বাদামী ল্যাব্রাডরটা এখন বাগানের মধ্যে তুমুল ছুটছে আর চিৎকার করছে। সামনের চার্চটা আলো দিয়ে খুব সাজানো । মেয়েটা এই মুহূর্তে ইউনিকর্নটার কথা ভাবছিল। বাথরুমের ফ্ল্যাশে একটা অদ্ভুত জলের শব্দ হচ্ছে, অনেকটা যেন ডাইকের মধ্যে দিয়ে জোয়ার আসছে অ্যামস্টার্ডামে। সে ভাবছিল একটা ডানা মেলা সমুদ্রের শব্দ। একটা অন্ধকারের শব্দ। ব্যাগ থেকে বার করে সে একটা চকোলেটে কামড় বসাল। একটা ডার্ক গন্ধ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখছিল। গন্ধটা কিসের কথা মনে পড়াচ্ছে ? সে হঠাৎ নিজের ওপর খুব রেগে উঠল। তার মনে পড়ে গেল আইভরি কোস্ট অথবা ঘানার কোকো বাগানের সেই সব বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোর কথা। যারা মালি, বুরকিনা ফাসো, এইসব সাব সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো থেকে সত্তর বা আশী ডলারেই বিক্রি হয়ে যায় কোকো ফার্মে ছোটবেলায়। বাড়ির লোকেরাই বেচে দেয়। যারা ম্যাচেট নিয়ে গভীর ঝোপ থেকে কোকো কেটে আনে। যাদের সকাল ছটা থেকে রাত নটা অবধি কাজ করতে হয়। খাবার মানে ভুট্টা সেদ্ধ আর কলা। রাত হলে জানোয়ারের মত দরজা জানলা হীন কাঠের আস্তাবলে বন্ধ করে রাখে। সুপারভাইসার বা অন্য ক্ষমতাশালীরা যাকে যখন ইচ্ছে তুলে নিয়ে যায়। মার খেয়ে বা ধর্ষণে মরে গেলে শরীরটা ছুঁড়ে দেয় পাহারাদার কুকুরগুলোর মুখে। মেয়েটার হঠাৎ মনে হলো নেসলের এই চকোলেটটায় ওই বাচ্চা মেয়েগুলোর রক্ত মিশে আছে, অত্যাচারিত যোনি থেকে গড়িয়ে আসা রক্ত। সে হড়হড় করে বমি করে ফেলল। সমুদ্রটা ক্রমশ তার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। মেয়েটা সমুদ্রটার থেকে পালিয়ে যেতে চাইছিল। এখন ইউনিকর্নই একমাত্র পারে তাকে এখান থেকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে। ইউনিকর্নও খুব কষ্ট পাচ্ছিল। তার বুক ফেটে যাচ্ছে উষ্ণ তেষ্টায়। কি অসম্ভব উষ্ণতা এই ঘরে। কয়েকদিন ধরে হোম যজ্ঞ চলছে। চলছে তান্ত্রিক অভিচার। মেয়েটার শরীরে কে যেন একের পর এক ছুঁচ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। লিভারে, কিডনিতে, ব্লাডারে, বুকের ডান পাশে। তার মা আর সনাতন ঠাকুর দুজনে সারারাত ধরে কি সব যেন মন্ত্র পড়েই চলেছে। মা উলঙ্গ হয়ে বসে আছে সনাতনের কোলে। আগুন জ্বলছে সামনে। সনাতনের হাত তার মায়ের বুকটাকে টিপেই চলেছে। সাড়ে তিন বছরের শরীরটা থেকে উথলে পড়ছে যন্ত্রণা, শরীরটা ছটফট করছে, বাধা দিতে চেষ্টা করছে অপুষ্ট ছোট ছোট হাত দিয়ে। বাষট্টি বছরের হোমগার্ড সনাতন ঠাকুর মাকে খিস্তি মেরে উঠল, ‘ভালো করে চেপে ধর না চুদির মেয়ে, এতো ছটফট করছে কেন।’ তারপর তার মুখে কি যেন ঢেলে দিল তীব্র, তেতো, ঝাঁঝালো। সে আর বাধা দিতে পারলো না। আড়ষ্টতার মধ্যে একের পর এক ছুঁচ ঢুকে যাচ্ছিল পাতাদের, পাখিদের, গাছেদের, মেঘেদের, সমুদ্রদের বুকে। মেয়েটা জানে তাকে এবার পালাতে হবে, পালাতেই হবে এখান থেকে। সেক্টর ফাইভ, বাঁকুড়ার হসপিটাল, ঘানার কোকোবাগান, অথবা সাউথ দিল্লির রাতের নির্জন রাস্তাটা থেকে। ‘ইউনিকর্ন, তুমি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে

3

সমুদ্রের ওপারে অথবা, অথবা আমাদের অ্যামস্টার্ডামের সেই ছোট্ট ফার্ম হাউসটায় ? যার উল্টোদিকে এখন
গম্ভীর চার্চ বেল বাজছে। চলো না ইউনিকর্ন, প্লিইইইজ চলো না।’
ওখানে সাদা কফিনটা নিয়ে সিমেট্রির দিকে এখন হেঁটে যাচ্ছেন কারা যেন। লাস্ট সার্ভিসের প্রেয়ার শব্দ ভেসে
আসছে চার্চ উইন্ডো থেকে। ভেসে আসছে ভায়োলিনের শব্দ, নাকি হার্প, আমি জানি না ? শুধু মাঝে মাঝে একটা চেনা গং বেজে উঠছে আর মেয়েটার মনিটরের স্ক্রিন ফুঁড়ে অপার্থিব বেগুনী অরোরা বোরিয়ালিসের হার্পুন স্ক্রিনসেভারে ফুটিয়ে তুলছে ‘মন খারাপ, মন খারাপ, মন খারাপ...’।
সেই মুহূর্তেই দূরে কোথাও একটা রক্তাক্ত ইরেজার দিয়ে কে যেন ইউনিকর্ণটাকে মুছে ফেলতে ফেলতে লিখে
রাখছে একমুঠো হা হা অন্ধকার...।


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ কার্তিক ঢক্

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  কার্তিক ঢক্



ভিতর- বাহির

যন্ত্রণার চোখ থেকে যে আলো ঝরে পড়ে
ধুলোর রুক্ষতায়
তাকে স্পর্শ করতে পারনি বলে
বকুল ফোটেনি উঠোনের ডালে
কোকিলের রিংটোন বাজেনি তাই...

তবু দ্যাখো,প্রতিটি সূর্যাস্তের শেষে
স্বপ্ন গুলি কানামাছি খেলে
ফেঁসে যাওয়া বালিশের তলায়-
ছতিচ্ছন্ন তুলো গুলি, তবু ছুঁয়ে থাকে
বরফের হাতে
পরস্পরের শরীর- 

ধ্রুবতারার আলো ভাঙা আরশির্তে
প্রতিফলিত হয়ে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে
ঘরের বাইরে...




২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ অভিজিৎ পালচৌধুরী

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||  অভিজিৎ পালচৌধুরী


ঘুম-নৌকো

ঘুম-নৌকো তুমি এসো
মিলিটারি বুটের নিচে
থেঁতলে যাওয়া সূর্যমুখীর
দেশটা পার হয়ে, এসো ।

ঘুম-নৌকো এসো
পুড়ে ছারখার গ্রামের বাড়িটি
দগ্ধ শরীরের মৃত্যু যন্ত্রণা
পেরিয়ে, তুমি এসো ।

ঘুম-নৌকো চলে এসো
ছিন্নভিন্ন বালিকা-যোনি
জ্বালিয়ে দেওয়া শরীরের
ছাই উড়িয়ে, তুমি এসো ।

এই অগাধ পাপ সমুদ্র
উজিয়ে তুমি এসো, 
আমাকে নিয়ে চলো
অন্য ঘুমের দেশে , ঘুম-নৌকো ।


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ সুমিতাভ ঘোষাল

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   সুমিতাভ ঘোষাল



গণতন্ত্রের উৎসবে 

জরাজীর্ণ যে লোকটি
খালি গায়ে নেংটি পড়ে
ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছেন
তিনি কোনও মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী নন
তিনি নেহাতই সোরেন মুর্মু
বহুদিন পিঁপড়ের ডিম খেয়ে
দিন গুজরান করেছেন
ওর ভাতের থালার ওপর দাঁড়িয়ে
ভারতবর্ষ অন্য দেশে বোমা ফাটিয়েছে
সোরেন মুর্মুর বুনে দেওয়া ফসল
আমরা বাজার থেকে কিনে এনেছি
ওর এই ডিগডিগে চেহারা
কল্পনাতেও আসেনি
খেয়াল করুন , আট লাইনের শুরুতে
ওর মাথায় চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত দিইনি
প্রয়োজন মনে করিনি

আজ সোরেন মুর্মু মদ খেয়ে টালমাটাল
পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের উৎসবে
ও প্রাণপণে মনে রাখার চেষ্টা করছে
কোন দল ওকে মদটা খাওয়াল

বেইমানি ওর রক্তে নেই 


২৫ শে বৈশাখ সংখ্যা ≈ দেবার্ঘ সেন

|| মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ||   দেবার্ঘ সেন 



জরা

সরে সরে যায়, 
এমনিই অসহায় 

আমাদের ধ্যানকক্ষ ছাদ। 

অবর্ণিত দূরের খেয়া,
যাত্রা রবে ফিরিয়ে দেওয়া 

আকুলের গ্রহণ প্রসাদ। 

কোরাসের ওংকার ধ্বনি 
সুর তার হোক যেমনই 

রক্ত-ছেদি ঘুম ভাঙানিয়া। 

প্রতিটি প্রহরের শেষে
আয়াতের উহ্য উন্মেষে 

জেগে থাকে করুণার মাফিয়া।